ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।।

সাহিত্য কী? আমি মনে করি, যেখানে আনন্দহারা আনন্দ পায়, ব্যথিতের ব্যথা জুড়ায়, হতাশের ভরসা জাগে, তাপিত আরাম পায়, দুখী সুখের খবর শোনে, প্রেমিক স্বর্গের সৌরভ শোঁকে, সে-ই সাহিত্য৷

ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক

সাহিত্যিক বিশ্বমানবের স্বজাতি ৷ কাজেই তিনি অসাম্প্রদায়িক ৷ শেকসপিয়ার ভেনিসের ইহুদি সওদাগর শাইলক ও মুসলমান ওসমান আলীর (Othello) প্ৰতি কম সহানুভূতি দেখান নি ৷ শরৎচন্দ্র বেচারা গফুর ও লাঠিয়াল আকবর সর্দারের চিত্র কী দরদের সঙ্গে এঁকেছেন ! রমণীহৃদয়ের সমস্ত প্রীতি শেখ আন্দুর জন্য উথলে পড়েছে ৷ এই সহানুভূতিই সাহিত্যের প্রাণ।

যেখানে রাজনীতি ছোট বড় তাবু গেড়ে তার দােরে সঙিনধারী সান্ত্রী খাড়া করে লিখে দিয়েছে-সাধারণের প্রবেশ নিষেধ, সেখানে সাহিত্য তার আনন্দমেলা খুলে বসেছে ৷ তার পেটে বড় বড় হরফে লেখা আছে-স্বাগত I যেখানে বড় ছোট, আমির গরিব, বামন চাড়াল, হিন্দু-মুসলমান সকলের জন্য অবাধ প্রবেশ I ঝগড়া, বিবাদ, সংকীর্ণতা, ঘৃণা, বিদ্বেষের ঠাঁই সেখানে নেই I

আমার ভাষাতাত্ত্বিক বন্ধু ডক্টর সুনীতিকুমার তাঁর কুমিল্লার অভিভাষণে সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতার নিন্দা করেছেন৷ আমি তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে একমত।কিন্তু যেখানে তিনি সাম্প্রদায়িকতা আবিষ্কার করেছেন, সেখানে আমি সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পাই না I সুনীতিবাবু বলেন, এক শ্রেণির মুসলমান লেখক হিন্দু-বিদ্বেষের বশে বাংলা ভাষায় দেদার আরবি পারসি শব্দ আমদানি করছে I আরবি পারসি শব্দের আমদানি যদি সাম্প্রদায়িকতা হয়, তবে সাধারণের দৃর্বোধ্য অপ্রচলিত সংস্কৃত শব্দের ব্যবহারকে আমরা কি বলব না মুসলমান-বিদ্বেষের বশে হিন্দুর সাম্প্রদায়িকতা?

প্রথমে দেখুন কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্যদেবের প্রতি কাজির উক্তিতে লিখেছেন :

গ্রাম সম্বন্ধে চক্রবর্তী হয় মোর চাচা ৷
দেহ সম্বন্ধ হৈতে হয় প্রায় সম্বন্ধ সাঁচা II
নীলাম্বয় চক্রবর্তী হয় তোমার নানা I
সে সম্বন্ধে হও তুমি আমার ভাগিনা I(চৈতন্য-চরিতামৃত)

কেউ কি বলবেন যে হিন্দু-বিদ্বেষের বশে কবিরাজ মহাশয় মুসলমানী চাচা, নানা শব্দ ব্যবহার করেছে? আরবি, পারসি শব্দের উপযুক্ত ব্যবহার অনেক হিন্দু লেখকই করেছেন I মধ্যযুগের দুজন প্রসিদ্ধ কবির লেখা থেকে নমুনা দেখাচ্ছি I মুকুন্দরাম কবিকঙ্কণ চক্রবর্ত্তী তার চণ্ডীমঙ্গলে লিখেছেন:

               ‘আইসে চড়িয়া তাজি              সৈয়দ মোগল কাজী
খয়রাতে বীর দেয় বাড়ী I

পুরের পশ্চিম পটী                  বােলায় হাসন হাঢী
এক সমুদয় গৃহবাড়ী।।

ফজর সময় উঠি                       বিছায়্যা লোহিত পাটী
পাচ বেরি করয়ে নামাজ ৷

ছিলি মিলি মালা ধরে,                 জপে পীর পেপাম্বরে,

              পীরের মােকামে দেই সাঁজ।।

দশ বিশ রেরাদরে                     সিয়া বিচার করে
অনুদিন কিতাব ও কোরাণ।।

সাঁজে ডালা দেই হাটে,              পীরের শিরণী বাঁটে,
সাঁজে বাজে দগড় নিশান।।

বড়ই দানেশবন্দ                     কাহাকে না করে ছন্দ,
প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছড়ি।

ধরয়ে কাম্বুজ বেশ,                        মাথে নাহি রাখে কেশ,
বুক আচ্ছা দিয়া রাখে দাড়ি।।

বসিল অনেক মিয়া                         আপন তরফ লৈয়া,
কেহ নিকা কেহ করে বিয়া।

মােল্পা পড়ায়্যা নিকা                      দান পায় সিকা সিকা,

                   দোয়া করে কলমা পড়িয়া।।

করে ধরি খর ছুরি                          কুকড়া জবাই করি
দশ গণ্ডা দান পায় কড়ি।

বকরি জবাই যথা                       মােল্লারে দেই মাথা,
দান পায় কড়ি ছয় ঘুড়ি।।

যত শিশু মুসলমান                       তুলিল মক্তব খান,
মখদুম পড়ায় পঠনা।

রচিয়া ত্রিপদী ছন্দ       পাচালি করিল বন্ধ
গুজরাট পুরের বর্ণনা৷’

ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর তাঁর যুবজনমনোহারী অন্নদামঙ্গল-এ  বাদশা ও মানসিংহের কথাবার্তা প্রসঙ্গে লিখেছেন-

পাতশা কহেন শুন মানসিংহ রায়।
গজব করিলা জুমি আজব কথায়।।
লস্করে দু’তিন লাখ আদমী তোমার।
হাড়ী ঘোড়া উট গাধা খচর যে আর।।
এ সকলে ঝড় বৃষ্টি হৈতে বাঁচাইয়া।
বামন থােরাক দিল অন্নদা পূজিয়া।।
সয়তান দির দাগা তূতের পূজায়।
আলো চাউল বেড়ে কলা ভুলাইয়া খায়।।
আমারে মালুম খুব হিন্দুর ধরম।

কহিযদি ইিন্দুপতি পইিবে সরম।
শয়তানে বাজি দিল না পেয়ে কোরাণ।
ঝুটযুট পড়ি মরে আগম পুরাণ।।
গোঁসাই মর্দ্দের মুখে হাত বুলাইয়া।
আপনার নুর দিলা দাড়ী গোঁপ দিয়া।।
হেন দাড়ী বামন মুড়ায় কি বিচারে।
কি বুঝিয়া দাড়ী গোঁপ সাঁই দিল তারে।।
আর দেখ পাঠা পাঠী না করি জবাই।
উভ চােটে কাটে বলে খাইল গোঁসাই।।
হালাল না করি করে নাহক হালাক।
যত কাম করে হিন্দু সকলি নাপাক।।
ভাতের কি কব পান পানির আয়েব।
কাজী নাহি মানে পেগাম্বরের নায়েব।।
বন্দেগী করিবে বন্দা জমিনে ঝুকিয়া।
করিম দিয়াছে মাথা করম করিয়া
মিছা ফান্দে পড়ে হিন্দু তাহা না বুঝিয়া।
যারে তারে সেবা দেয় ভূমে মাথা দিয়া।
যতেক বামন মিছা পুথি বানাইয়া।
কাফের করিল লোকে কােফর পড়িয়া।।
দেবী ব’লে দেয় মিছে ঘড়ায় সিন্দুর।
হায় হায় আখের কি হইবে হিন্দুর।।
বাঙালিরে কত ভাল পশ্চিমার ঘরে।
পান পানি খানা পিনা আয়েব না করে।।
দাড়ী রাখে বাঁদী রাখে আর জবে খায়।
কান ফোঁড়ে টিকি রাখে এই মাত্র দায়।’

আরবি পারসি শব্দের ব্যবহার সম্বন্ধে দুই জন সাহিত্য-মহারথীর মত উদ্ধৃত করছি l

রবীন্দ্রনাথ বলেন :

পার্সি আরবি শব্দ চলতি ভাষা বহুল পরিমাণে অসংকোচে হজম করে নিয়েছে ৷ তারা এমন আতিথ্য পেয়েছে যে তারা যে ঘরের নয় সে কথা ভুলেই পেছি। ‘বিদায়’ কথাটা সংস্কৃত সাহিত্যে কোথাও মেলে না। সেটা আরবি ভাষা থেকে এসে দিব্যি সংস্কৃত পোষাক প’রে বসেছে। ‘হয়রান ক’রে দিয়েছে’ বললে ক্লান্তি ও অসহ্যতা মিশিয়ে যে ভাবটা মনে আসে, কোনো সংস্কৃতের আমদানি শব্দে তা হয় না। অমুকের কণ্ঠে গানে ‘দরদ’ লাগে না, বললে ঠিক কথাটা বলা হয়, ও ছাড়া আর কোনো কথাই সেই। গুরু-চণ্ডালির শাসনকর্তা যদি দরদের বদলে সংবেদনা চালাবার হুকুম করেন,তবে সে হুকুম অমান্য ক’রলে অপরাধ হবে না।’ (বাংলা ভাষা পরিচয়, পৃ ৫২-৫৩)।

দীনেশ বাবু বলেন :

‘বর্তমান কালে গোঁড়া হিন্দুরা দিবা-রাত্র যেসকল উর্দু কি ফারসি শব্দ জিহবাগ্রে ব্যবহার করিয়া থাকেন, লেখনী মুখে তাহা বদলাইয়া তৎস্থলে সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগ করেন, এইরূপে ‘হজম’ স্থলে ‘পরিপাক’ বা ‘জীর্ণ’, ‘খাজনা’ স্থলে ‘রাজস্ব’, ‘ইজ্জৎ’ স্থলে ‘সম্মান’, ‘কবর’ স্থলে ‘সমাধি’, ‘কবুল’ স্থলে ‘স্বীকার’, ‘আমদানি’ স্থলে ‘আনয়ন’ বা ‘সংগ্রহ করিয়া আনা’, ‘ খেসারৎ’ স্থলে ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘জমিন’ স্থলে ‘ভূমি”, ‘খানদান’ স্থলে ‘ পদ-প্রতিষ্ঠা’ ইত্যাদি কথার প্রয়োগ করেন ৷ একটু কাগজ লইয়া টুকিয়া দেখিবেন, বাঙ্গালা ভাষার এইরূপ বিদেশি শব্দ কত প্রচলিত হইয়া গিয়াছে। ইহাতে আমাদের ভাষার জাত যায় নাই I পরের জিনিষ আত্মসাৎ করিবার শক্তি সতেজ জীবনের লক্ষণ I শব্দগুলি বাদ সাদ দিয়া ভাষা শুদ্ধ করিয়া ইহাকে তুলসীতলা করিয়া রাখিলে হিন্দু মুসলমানের উভয়ের মাতৃভাষাকে আমরা খণ্ডিত ও দৃর্ধল করিয়া ফেলিব I’ (প্রাচীন বাঙ্গালা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, পৃ. ৯৯৮) I

মোট কথা বাংলা ভাষায় জবরদস্তি করে যেমন অপ্রচলিত অনাবশ্যক আরবি পারসি শব্দের ব্যবহার অসঙ্গত, তেমনি অপ্রচলিত অনাবশ্যক সংস্কৃত ব্যবহার করাও অসঙ্গত ৷ বে-দরকারে ইংরাজির মিকচার করাও তেমনি আমার অসহ্যI আমি এসব নিন্দা করি; কিন্তু যা বাংলায় এসে গেছে, যা বাংলার হাড়ে মাসে ঢুকে গেছে, তা আরবি, পারসি, তুর্কি, পর্তুগিজ, ডচ, ফরাসি, ইংরাজি, আর্য বা অনার্য যা হোক, তাতে আমি আপত্তি করি না। আমি বাংলা ভাষাকেই চাই, তাকে শুদ্ধি বা খতনা করবার পক্ষপাতী নই I

সে যাই হোক, ‘সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা বলতে আমি বুঝি সাহিত্যের ভিতর দিয়ে অন্য সাম্প্রদায় বা ধর্ম বিশেষের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালান, কোনও জাতির ঐতিহাসিক চরিত্রকে বা কোনও ধর্মাবলম্বীর সম্মানিত পুরুষদের হীন বা বিকৃত করা ৷ দেশের সাম্প্রদায়িক বিবাদের মূলে এই সাম্প্রদায়িক সাহিত্য I দুঃখের সঙ্গে আমি বলতে বাধ্য যে বাংলার হিন্দু লেখকেরা এর সূত্রপাত করেন I তারপর মুসলমান লেখকেরা গালির বদলে গালি শুরু করেনI এর জন্য অবশ্য ব্রিটিণের ভেদনীতি ছিল অনেকটা দায়ী I

আমরা পূর্বে পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িকতা-বিষবর্জিত ‘ পাক সাফ’ সাহিত্য চাই-দেশের মঙ্গলের জন্য, দশের মঙ্গলের জন্য I সাহিত্য যদি সত্য ও শিব হয়, তবে তা সুন্দর হবেই I নয়ত সে সাহিত্যই হবে না, হবে একটা অপসাহিত্য I আমরা যদি বাংলা ভাষা থেকে এই অপসাহিত্য দূর করিতে পারি, তবে প্রকৃত সাহিত্যের সেবা হবে, সত্য-শিব-সুন্দরের অর্চনা হবে, পাকিস্তানের মঙ্গল হবে I

(উৎসঃ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্মারকগ্রন্থ, বাংলা একাডেমি, প্রথম পুনর্মুদ্রণ, ২০১৫, পৃষ্ঠা ২১৭-২২০)

Facebook Comments