প্রশান্ত ত্রিপুরা।।
পৃথিবীর সকল আধুনিক রাষ্ট্রের মতই বাংলাদেশও একটি বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি ও বহু জাতির দেশ। এদেশের ইতিহাস ও ভূগোল সম্পর্কে ওয়াকেবহাল সবাই জানেন যে, এই ভূখন্ডে বাংলা ও বাঙালি ছাড়াও অন্য আরো অনেক ভাষা ও জাতির অস্তিত্ব বরাবরই ছিল। অবশ্য একটি জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষিতে ‘জাতি’ শব্দের অর্থ ও প্রয়োগের ক্ষেত্র অনেকটা পাল্টে গেছে, এবং অধুনা রাষ্ট্রের অন্তর্গত জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বোঝানোর জন্য সাংবিধানিকভাবে বরাদ্দ করা হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু পদ – উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় – যেগুলো মূলত প্রয়োগ করা হয় বাঙালি ভিন্ন অন্য যেসব জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা অধিকাংশই পরিচিত হতে চায় ‘আদিবাসী’ হিসেবে, তাদের জন্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনগণ ভাষা আন্দোলনের একটি গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক বাহক বটে, কিন্ত একদেশদর্শী জাতীয়তাবাদে আচ্ছন্ন চিন্তাচেতনার কারণে এদেশে ভাষা সম্পর্কে অনেকের ধারণা বেশ সীমিতই রয়ে গেছে। বিশেষ করে বাংলা ভিন্ন অন্যান্য দেশি ভাষা নিয়ে এদেশে জানাশোনার ব্যাপ্তি ও গভীরতা খুবই অপ্রতুল। আসলে বাংলাদেশ যে একটি বহুভাষার দেশ, এই বাস্তবতারই কোনো স্বীকৃতি নেই এদেশের সংবিধানে, এবং এই ব্যত্যয় নিয়ে এদেশের বিদ্বৎসমাজ যে খুব চিন্তিত বা সরব, তাও বলা যাবে না। বরং তদের রচিত পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদিতে এদেশের প্রান্তিক জাতিসমূহের উপস্থিতি খুব একটা নেই, এবং থাকলেও তা খুব হালকা অথবা ছক-বাঁধা ভাবে তুলে ধরা হয়, যার একটা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ভাষা-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিককালের ঘটনা হলেও এই মতাদর্শের উন্মেষ ও প্রসারের পর পৃথিবীর অন্যত্র যেমনটা ঘটেছে, তেমনি বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের মনোযোগও কেন্দ্রীভূত ছিল বাঙালি জাতি বা বাংলা ভাষার প্রাচীনত্ব, বিশেষত্ব ইত্যাদির দাবি প্রতিষ্ঠায়। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস যে শুধুমাত্র বাঙালির ইতিহাস নয়, তা বহুভাবেই দেখানো যেতে পারে। যেমন, বাঙালি ছাড়াও আরো বহু জাতির মানুষ সক্রিয়ভাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, সহযোগিতা করেছিল, জীবন দিয়েছিল। ওরাঁও, কোচ, সাঁওতাল, রাজবংশী, মালো, গারো, হাজং, খাসিয়া, মণিপুরী, ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা কারা ছিল না তাদের মধ্যে? তাদের কথা বাংলাদেশের সমকালীন বাংলা সাহিত্য ও রচিত ইতিহাসে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা গবেষণাসাপেক্ষ বিষয় হতে পারে, কিন্তু সংবিধানের ভাষায় বিষয়টার নিষ্পত্তি কিভাবে হয়েছে, তা দেখে নেওয়া যেতে পারে। সেখানে, নাগরিকত্ব বিষয়ক ৬(খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন’ এবং দ্বিতীয় ভাগে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ হিসাবে উল্লিখিত ‘জাতীয়তাবাদ’কে (৯ নং ধারা) বর্ণনা করা হয়েছে নিম্নরূপভাবে:

ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালী জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালী জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।

বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও ইতিহাসের বাঙালি-সর্বস্ব বয়ানকে সাংবিধানিক মহিমা (‘বাঙালী’ বানানে) দেওয়ার পর ‘অন্য’দের অস্তিত্বের স্বীকৃতি হিসাবে দেখানো ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ‘২৩ক’ ধারার আসলে বিশেষ কোনো অর্থ থাকে না। উল্লেখ্য, এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ লক্ষ্যণীয় যে, এতে ‘আদিবাসী পরিচয়ের দাবির সাথে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট দুটি বিষয় ভূমি ও ভাষার কোনো উল্লেখ নেই।

বাংলাদেশের সংবিধান যাঁরা খুঁটিয়ে দেখেছেন, তাঁরা জানেন এখানে ভাষার প্রসঙ্গ এসেছে খুবই সংক্ষেপে, মূলত রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতির মাধ্যমে। বাংলাদেশে যে অন্যান্য ভাষার প্রচলন রয়েছে, তার উল্লেখ কোথাও নেই, শুধুমাত্র সংবিধানের একেবারে শেষে ইংরেজির উল্লেখ আছে, এটি যে এদেশের সরকারি নথিপত্র (সংবিধানসহ) লেখার কাজে ব্যবহৃত হয়, তার একটি পরোক্ষ স্বীকৃতি হিসেবে। এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-ভাষা প্রভৃতির কারণে কোনো ব্যক্তিকে বৈষম্যের শিকার করা যাবে না, মানবাধিকার সনদের এই ধারা সংবিধানে অনুসৃত হলেও সেখানে উল্লিখিত বিষয়সমূহের তালিকা থেকে ভাষাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি কতটা সচেতনভাবে করা হয়েছে, তা একটি গবেষণাসাপেক্ষ বিষয়। সে আলোচনায় না গিয়ে এখানে অন্য একটা প্রাসঙ্গিক বিষয় উল্লেখ করা যায়, সেটা হল, ‘রাষ্ট্রভাষা’র ধারণার আড়ালে বাংলা ছাড়া অন্যান্য দেশি ভাষাই যে শুধু হারিয়ে গেছে তা নয়, বরং খোদ বাংলার বহু রূপও ঢাকা পড়ে গেছে।
উল্লেখ্য, বাংলা বা অনুরূপ যে কোনো ভাষার সীমানা কোথায় শেষ হয়েছে, আর কোথায় অন্যান্য ভাষা (যেমন অসমিয়া) শুরু হয়েছে, এ প্রশ্নগুলির কোনো সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর নেই। এ ব্যাপারে ঐতিহাসিক ও সামাজিক ভাষাবিজ্ঞানীদের সাথে জাতীয়তাবাদের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক প্রবক্তাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে মৌলিক প্রভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে একটা বিষয় এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, তা হচ্ছে, বাংলার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ বা তথাকথিত ‘উপভাষা’সমূহের সাথে প্রমিত বাংলার পার্থক্য ও সম্পর্ক। বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে যে বাংলা স্বীকৃত বা প্রতিষ্ঠিত, তা হচ্ছে একটি লিখিত প্রমিত ভাষা, যা সে অর্থে অধিকাংশ বাংলাদেশির প্রকৃত ‘মাতৃভাষা’ নয়। বাংলার যে বিভিন্ন আঞ্চলিক কথ্য রূপ রয়েছে, যেগুলি সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহের সাধারণ মানুষের মাতৃভাষা, সেগুলির কোনো প্রশাসনিক মর্যাদা বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই, বরং সরকারিভাবেই শ্রেণিকক্ষে এসব ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এইসব ভাষার কিছু গৎ-বাঁধা এবং অনেকাংশে প্রেক্ষাপট-বিচ্যুত বা হাস্যউদ্রেককারী পরিবেশনা অবশ্য নাটক ও সাহিত্যে দেখা যায়, শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালির ভাষিক কর্তৃত্বের আওতায়, কিন্তু এসব ভাষা নিজেরাই সাহিত্যের বাহন হতে পারে কিনা, বা পারলে তা কি আকারে কতটুকু হতে পারে, সে ধরনের প্রশ্ন ওঠানোর দরকার থাকলেও এগুলি নিয়ে ব্যাপক কোনো আলোচনা বা বিতর্ক দেখা যায় না। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বাংলার সীমান্তে ‘অন্য’ যেসব জাতি ও ভাষা রয়েছে, তাদের অনেকের ভাষার প্রকৃত স্বরূপ ও ভূমিকা আসলে ‘আঞ্চলিক’ বাংলাসমূহের মতই। যেমন, প্রমিত বাংলার তুলনায় সিলেটি, চট্টগ্রামি ও অন্য কিছু আঞ্চলিক বাংলার যে দূরত্ব, চাকমা, বিষ্ণুপ্রিয়া, হাজং, কামতাপুরি, সাদ্রি, নাগরি প্রভৃতি ভাষা যে তার চেয়ে খুব বেশি দূরে রয়েছে, তা বলা যাবে না। তথাপি বাংলা ভিন্ন অন্যান্য ভাষা বলতে আমরা শুধু শেষোক্ত ভাষাগুলির কথাই ভাবি, কিন্তু আঞ্চলিক বাংলাগুলিকে বিবেচনায় আনি না একেবারে, সেটা সাহিত্য বা শিক্ষা, যে প্রেক্ষাপটে হোক না কেন।

আমরা যদি মেনে নেই যে বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা ও বহু জাতির দেশ, এমন একটি রাষ্ট্র যা শুধু বাঙালির নয় – বা সব বাঙালিরও নয় – কিন্তু আসাম, ওরাঁও, কোচ, খাসিয়া, খিয়াং, খুমি, গারো, চাক, চাকমা, ডালু, তঞ্চঙ্গ্যা, পাত্র, বম, বানাই, মণিপুরী, মারমা, মাহাতো, ¤্রাে, সাঁওতাল, মুন্ডা, রাখাইন, হাজংসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত প্রায় অর্ধশত জাতিরও, তাহলে আমরা একমত হতে পারি যে এই দেশের সংবিধান থেকে শুরু করে ইতিহাস, সাহিত্য, অনেক কিছুতেই তাদের অবদান ও অস্তিত্বের কথা আরো স্পষ্ট করে উল্লিখিত হওয়া দরকার। সংবিধানে যেমন রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছাড়াও সকল দেশি ভাষার স্বীকৃতি প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষা, সাহিত্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে এসব ভাষা যথাযথ ব্যবহারের জন্য কার্যকর পন্থা ও নীতিমালা উদ্ভাবন করা দরকার। অন্যদিকে খোদ প্রমিত বাংলাকেও বের করে নিয়ে আসতে হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ গন্ডী থেকে। আমাদের ভাবতে হবে, ‘মাতৃভাষা যার যার, রাষ্ট্রভাষা সবার।’ এভাবে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে প্রচলিত অনেক সমস্যাজনক বিভাজন ও সংকীর্ণতাকে ছাপিয়ে আমাদের খুঁজে নিতে হবে বহুভাষা ও বহুজাতির বাংলাদেশের নূতন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি।

সূত্র

Facebook Comments