বই পর্যালোচনাঃইন্ডিয়ান আইডিওলজি/পেরি আ্যন্ডারসন।।
খালেদুর রহমান সাগর।।

পেরি অ্যান্ডারসন বর্তমান সময়ের একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক। তার লিখিত বিভিন্ন বই বাজারে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে। তার বইগুলির মধ্যে লিনিয়েজ অফ দি অ্যাবস্যুলেট স্টেট,প্যাসেজ ফ্রম এন্টিকূয়্যেটি টু ফিউডালিজম,নিউ ওল্ড ওয়ার্ল্ড খুবই বিখ্যাত। আর কিছুদিন আগে তার প্রকাশিত বই ইন্ডিয়ান আইডিওলজি বাজারে এক ব্যাপক সরগরম আওয়াজ তুলেছে । এ বইটির তিনটি অংশ প্রথমে লন্ডন বুক রিভিউতে কিস্তি আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে এই রচনা অংশগুলি ইন্ডিয়ান আইডিওলজি নামক বই আকারে ২০১২, সালে ভারসো নামক এক প্রকাশনী থেকে বের হয়। ইন্ডিয়ান আডিওলজি ভারতে চলমান ভারতীয় মতাদর্রশ বা ইন্ডিয়ান আইডিওলজির ঊপর এক প্রচন্ড আঘাত হেনেছে। প্রচলিত ইন্ডিয়ান আইডিওলজির ধারক বাহকদের উপর এ এক প্রচন্ড আঘাত। নিচের বুক রিভিউতে এই বিষয়েই আলোচনা করা হবে। প্রফুল্ল বিদওয়ালি নামে এক ভদ্রলোক এই বই স¤পর্কে পেরি অ্যান্ডারসনের এক সাক্ষাৎকার নেন যেখানে অ্যান্ডারসন বলেন যে “তার বইয়ে পাচঁটি বিষয়কে ধরে যুক্তি দাড় করানো হয়েছে যা প্রচলিত ইন্ডিয়ান মতাদর্শের বিরোধী ।” যেমন: “১. ৬ হাজার বছরের ভারতীয় ঐক্য যা কল্পনা করা হয় তা আসলে একটি মিথ। ২. রাজনীতিতে গান্ধী কর্রতৃক ধর্মের অনুপ্রবেশ দূর্যোগ ডেকে এনেছে। ৩. ভারত বিভাগের প্রাথমিক কারণ কংগ্রেস ব্রিটিশ রাজ নয়। ৪. নেহেরু প্রভাবিত রিপাবলিকের উত্তরাধিকার বর্তমানে যা চলমান তা অনেক ত্র“টিপূর্রণ, যেমনটি তার প্রশংসাকারীরা করে থাকে। ৫.ইন্ডিয়ান গণতন্ত্র জাতপাতের অসাম্যের কারণে ত্র“টিপূর্রণ নয় বরঞ্চ তা এই ভিত্তির উপর ভর করে টিকে আছে।”

পেরি অ্যান্ডারসন এই বইয়ে প্রচলিত ইন্ডিয়ান আইডিওলজির উপর ব্যাপক আক্রমণ পরিচালনা করেছেন।তিনি তার লেখায় সরাসরিভাবে প্রচলিত ইন্ডিয়ান আইডিওলজির গুণগ্রাহী মেঘনাদ দেশাই, রামচন্দ্র গুহ, প্রতাপ ভানু মেহতা ও অমর্ত্য সেনদের ইত্যাদি চিন্তকদের উপর এক ব্যাপক বজ্রপাত নিক্ষেপ করেছেন । অ্যান্ডারসনের মতে ইন্ডিয়া তার ছয় হাজার বছরের ইতিহাসে কখনও এক দেশ আকারে বিরাজ করত না । ভারতে নানান সময়ে নানান সাম্রাজ্য বিভিন্ন ভৌগলিক পরিসীমায় বিভক্ত ছিল। তার মতে এমনকি ব্রিটিশরা যখন এ দেশ দখল করে তখনও তারা এই দেশকে বৈচিত্রময়ী দেশ আকারেই বিবেচনা করত। তার মতে বৈচিত্রময়ীতার কারণেই ব্রিটিশরা এই দেশটাকে সহজে দখলে আনতে পেরেছে । যেমন সিপাহী বিদ্রোহের সময় শিখ ও গোর্খাদের সহযোগিতা। তারও আগে স্থানীয় সৈন্য দিয়ে একটু একটু করে পুরো উপমহাদেশ দখল করা ইত্যাদি। এ কারণেই তিনি নেহেরুর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়ার উপর তার সমালোচনার বাণ নিক্ষেপ করেছন । এই বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি ১৮৭৯ সালের ইডেন কমিশন ও ১৯৪২ সালে ভাইসরয়ের ব্যাখ্যাকে হাজির করেছেন। এ কারণেই তিনি নেহেরুর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়ার উপর তার তীব্র সমালোচনার বাণ নিক্ষেপ করেছেন।এ বই মোট তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত- প্রথম অংশ স্বাধীনতা সংগ্রাম, দ্বিতীয় অংশ দেশভাগ ও তৃতীয় অংশ রিপাবলিক। নিচে এই বিষয়গুলি ধরেই আলোচনা হবে।
অ্যান্ডারসনের মতে ভারতের প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় ১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, যা ১৯০৬ সালে সীমিত পার্লামেন্টারি ব্যাবস্থার প্রচলন করে। এই নির্রবাচনে অবশ্য শতকরা দুইজন অংশগ্রহণ করেছিল। ১৯১৪ সালে গান্ধী ভারতে আসার পর থেকে রাজনীতিতে এক ব্যাপক পরিবর্রতন শুরু হয়। তার নেতৃত্বে ১৯১৯-২১,১৯৩০-৩১ এবং ১৯৪২-৪৩ সালে এক ব্যাপক আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল । কিন্তু অ্যান্ডারসনের মতে সমস্যা হল গান্ধী এই আন্দোলনগুলিকে প্রকৃত স্বাধীনতার সংগ্রামে পরিবর্রতন করতে ব্যার্রথ হন। তার মতে গান্ধী প্রধান সমস্যা হল তিনি রাজনীতির সাথে ধর্মকে সংযুক্ত করেন যার ফলে স্বাধীনতা সংগ্রাম সাম্প্রদায়ীকতার রূপ পরিগ্রহ করে। গান্ধীর এই রাজনীতিকে অ্যান্ডারসন ব্যাখা করার জন্য ক্যাথরিক ঢিডরিকের বই ‘এ পলিটিক্যাল ও¯িপরিচুয়াল’ সাহায্য নিয়েছেন। তার মতে এ বইটি পাঁচ বছর আগে বাজারে প্রকাশিত হলেও এ নিয়ে কোন আলোচনা বাজারে অনুপস্থিত। টিডরিকের মতে গান্ধীর রাজনৈতিক আদর্রশ আসলে গড়ে উঠেছে প্রধানত জৈন আশ্রিত হিন্দু গোড়াঁবাদ ও ভিক্টোরিয়া সাইকোসেন্সি থেকে। গান্ধীর ভাষায় তা হল মোক্ষ লাভ যার ফলে সর্রগ ও পৃথিবী একাকার হয়ে যাবে। গান্ধী পরবর্তীতে তার মতাদর্শে এ বিষয়গুলিকেই ব্যাবহার করেছেন। গান্ধীর আরেকটি সমস্যা হল তিনি আয়ারল্যান্ডের হোম রুল আন্দোলনের ধারণাকে স্বরাজ আন্দোলনে ব্যাবহার করলেও,তিনি এই আন্দোলনের অভ্যূথ’ানমূলক রূপকে এড়িয়ে গিয়েছেন। তিনি হিন্দু ধর্মকেই ভারতের একমাত্র নিজের ধর্রম আকারে চিহ্নিত করেছিলেন যার ফলে এ বিষয় নিয়ে হিন্দু মুসলমান স¤র্পক তিক্ত আকার পরিগ্রহ করেছিল। এমনকি অসহযোগ আন্দোলনের সময় হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে যে ঐক্য হয়েছিল সে আন্দোলনের সেকূল্যার রূপ নিয়েও জিন্নাহ সন্দেহ পোষণ করেছিলেন। অ্যান্ডারসনের মতে তার আর একটি সমস্যা হল তিনি কোন ধরনের বড় সামাজিক পূনরবিন্যাস চাননি।যেমন ধর্মের যুক্তি হাজির করে তিনি জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের বিরোধীতা করেছিলেন। যদিও তিনি বারদোলিতে কর দিতে অস্বীকার করেছিলেন কিন্তু সেখানে বহাল ছিল ছিল রায়তারি ব্যাবস্থা।তার মতে চৌরিচাওরা হত্যাকান্ডের পর মহাবিদ্রোহের ভয়ে তিনি তার আন্দোলনের সমাপ্তি টেনেছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনে গানধীর হঠাৎ সরে যাওয়া তার আপোষকামিতাকেই চিহ্নিত করে।আয়ারল্যান্ডের তৎকালীন স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে এই সংগ্রামকে অ্যান্ডারসন তুলনা করেছেন। সংগ্রামকালীন আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ সৈন্য ও জনসংখ্যার অনুপাত ছিল ১:১৩০ অন্যদিকে ভারতে ছিল ১:৭৫০। সৈন্যের এত অসাম›ঞ্জস্য থাকার পরেও আইরিশরা স্বাধীনতা লাভ করল আর ভারত তাতে হল অক্ষম। মুসলিমদের জন্য ১৯২৭ সালে নেহেরুর পিতা যে বিধানের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তা কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ বিরোধিতার কারণে ব্যার্রথ হয়। তাই ১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল প্রায় শূণ্যের কোটায়। গান্ধীর বিরুদ্ধে আরেক প্রধান অভিযোগ হল তিনি অ¯পৃশ্যদের পৃথক ভোটাধিকারের ব্যাবস্থাকে কূটকৌশলে পরাভূত করেছিলেন। আম্বেদকার এই কূট কৌশলকে ব্ল্যাকমেইল বলে খোদক্তি করেছিলেন যা অ¯পৃশ্যদের জন্য সবর্নাশ ডেকে আনবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন । গান্ধী স¤পর্কে এ বইয়ে আরেকটি অভিযোগ হল তিনি তার ধূর্রত কৌশল প্রয়োগ করে পার্টির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। যার ফলে তিনি কোন দায়িত্ব না নিয়ে পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পেয়েছিলেন। সুভাষকে পার্টি থেকে অপসারণ কালে গান্ধীর বিরুদ্ধে মাড়োয়াড়ি তোষণের অভিযোগ পাওয়া যায়। দেশ বিভাগ অংশে অ্যান্ডারসন সুভাষকে গান্ধী ও নেহুরুর তুলনায় শিক্ষা ও মেধায় অগ্রগামী আকারে চিহ্নিত করেছেন। তিনি গান্ধী ও নেহুরুর শিক্ষার পশ্চাৎপদতাকে এখানে আলোচনা করেছন। গান্ধী যখন অ¯পৃশ্যদের পৃথক ভোটাধিকার নিয়ে অনশন করছিলেন তখন এ বিষয়ে নেহেরু কোন মন্তব্য করেননি। এমনকি নেহুরুর ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়াতেও হিন্দুত্ববাদকে ভারতের প্রতীক আকারে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া মানে ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া। ১৯৩৭ সালের পরে মুসলমানদের সাথে স¤র্পক বৃদ্ধির দায়িত্ব পরেছিল নেহুরুর উপর যাতে তিনি পুরোপুরি ব্যার্থ হন। সুভাষের বিপরীতে জনগণের সাথে তার যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত কম।নেহুরুর বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হল তিনি লাহোর প্রস্তাবকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলে›। নেহেরু স্বাধীনতার পর ক্যাবিনেট মিশন মানতে অস্বীকার করেছিলেন।যার ফলে মুসলমানদের ভারত বিভাগের দাবি আরো জোরালো হয়েছিল। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ কংগ্রেস নিয়ন্ত্রানাধীন সরকার থাকাকালীন সময়ে উত্তর ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার অভিযোগে তিনি একপ্রকার লা›িছত হয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালে দিকে বন্দে মাতরম কেন্দ্রীক সরকার মুসলমান বিদ্বেষী হিন্দুত্বমূলক সরকার গঠন করেছিল যার ফলে সাম্প্রদায়িকতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। তিনি বাংলা বিভাগের জন্য দায়ী হিন্দু সভার সদস্য শ্যামাপ্রসাদ মূখার্জিকে তার মন্ত্রীসভার সদস্য করেছিলেন। বেশিরভাগ দেশীয় রাজ্য বা পিন্সলি স্টেট গুলি হিন্দু অধ্যুষিত অথবা হিন্দু রাজার নিয়ন্ত্রনে থাকার কারণে তিনি ছলে বলে অথবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এইগুলি দখল করে নেন। এই বইয়ে কাশ্মীরকে নেহেরুর বলপূর্রক দখলের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। কাশ্মীরে সেই সময় স্বাধীনতার দাবিতে এক প্রগতিশীল আন্দোলন ব্যাপকভাবে দানা বেধে উটেছিল। কিন্তু মাউন্টব্যাটনের সাথে ষড়যন্ত্র করে নেহরু কাশ্মীর দখলে নিয়ে নেন। এরজন্য তিনি র্যা ডক্লিফকে প্রভাবিত করে মুসলমান অধ্যূষিত পা›ঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলা ভারতের অভ্যন্তরে ডুকিয়ে নেন। যা ছিল কাশ্মীরে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা। নেহেরু পাঠান আগ্রাসনের কথা বলে ভারতীয় বাহিনী দিয়ে কাশ্মীর দখলে নিয়ে নেন। গান্ধী এ অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। এর বিপরীতে জিন্নাহ যখন তার সৈন্য সমাবেশিত করতে চেয়েছিলেন তখন তৎকালনি সেনা প্রধান অচিনলেক কাশ্মীরে অভিযানে বাধাপ্রধান করেছিলেন। যিনি সরাসরি মাউন্টব্যাটন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কাশ্মীরের নেতা আব্দুল্লার সাথে নেহেরুর প্রতারণাকে এই বইয়ে তীব্রভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। যেখানে এখন ৪০০০০০ সৈন্য মোতায়েন আছে। রিপাবলিক অংশে নেহেরুর হিন্দুত্ববাদীতাকে আবার চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে তিনি স্বাধীনতাকে হিন্দু শাস্ত্র মতে বরণ করেছিলেন তা উল্লেখ করা হয়েছে । এছাড়া এই বইয়ে রিপাবলিককে প্রদেশের উপর প্রায় র্পূণ নিয়ন্ত্রনকে ব্যাপকভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ আমলাতান্ত্রিক ব্যাবস্থার কোন পরিবর্রতন করা হয়নি যা স্বাধীনতা সংগ্রামকালীন মানুষের উপর তীব্র নিপীড়ন চালিয়েছিল। এমনকি সংবিধানের ৩৯৫টি ধারার মধ্যে ২৫০টি ধারা সরাসরি ১৯৩৫ ভারত শাসন আইন থেকে নেওয়া হয়েছিল। ১৯৩৫ সালের আইনের ৯৩ ধারাকেও এখানে বলবত রাখা হল যা দ্বারা প্রদেশের সরকারকে যেকোন সময় বহিষ্কার করা যায়। এই আইনের উপর ভিত্তি করে নেহেরু সময় কেরেলা প্রাদেশিক সরকার সহ বিভিন্ন সরকারকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। নেহুরুর সময়ে শিল্পায়নের কথা বলা হলেও তার সময়ে বড় ধরণের কোন কৃষির ভুমি সংস্কার হয়নি। বরঞ্চ তার বিপরীতে মিলিটারিতে ব্যাপক ব্যায় বেড়েছিল। এখানে নেহেরুর কুখ্যাত হায়দ্রাবাদের হত্যাকান্ডকে ব্যাপকভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। নাগাল্যান্ড, মনিপুরী ও অ›ঞ্চলকে জোর পূর্রব দখল ও নিপীড়নকে তীব্রভাবে সমালোচনা করা হয়েছে।১৯৬২ সালে চীনের সাথে হটকারিমূলক যুদ্ধকে ব্যাপকভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। শিখদের বিরুদ্ধে স্বর্রণ মন্দির অভিযানকে কেন্দ্র করে হত্যাকান্ডকে উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দু মুসলমানদের জন্য সাবর্জনীন আইন করার ব্যার্থতাকে এই বইয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। আম্বেদকার হিন্দুবিবাহ বিল করতে গিয়ে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ হন। তিনি নিজেকে একজন পুতুল আকারে চিহ্নিত করেছিলেন, আম্বেদকারের মতে যদিও লোকে আমাকে সংবিধান প্রণেতা আকারে চিনে থাকে। অ¯পৃশ্যরা যদিও কিছু অধিকার পেয়ে থাকে এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবস্থা আরও খারাপ। যেমন স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সোমনাথ মন্দির নির্মাণ। মুসলমানদের সংখ্যা পরিসংখ্যানে ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেখানো । যদিও কিছু মুসলমানদের প্রতীক আকারে এখানে পদ দেওয়া হয় তা অবশ্য বাস্তবতার সাথে স¤পূর্রণ বিপরীত। সাচার কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে তিনি ভারতীয় মুসলমানদের দৈন্য দশাকে চিহ্নিত করেন । ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীতে মুসলমান সৈন্যর সংখ্যা তার জনসংখ্যার অনুপাতে অত্যন্ত কম । ইন্ডিয়ার ১৯৮৪ ও ২০০২ সালের দাঙ্গায় কংগ্রেসের ভূমিকাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান সেক্যূলারিজম একপ্রকার অপ্রত্যক্ষ হিন্দুত্ববাদ এ কথাই এখানে চিহ্নিত করা হয়েছে। অ্যান্ডারসন ভারতে হিন্দুত্ববাদের আগমনকে ফ্যাসিবাদ মনে করেন না, কেননা এখানে ইউরোপে ফ্যাসিবাদ উথ’ানকালীন যে উপাদান বিরাজমান ছিল তার অস্তিত্ব এখানে একেবারেই নেই। বর›ঞ্চ তা এক ভিন্ন ধরণের হিন্দুত্ববাদী সামাজিক ম্যাট্রিক্স। যেখানে মুসলমানদের সেক্যূলারিজমের শত্র“ আকারে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বল্লভ ভাই প্যাটেলের নামে পৃথিবীর সবচেয় বড় ভাস্কর্রয্য বানানো হচ্ছে তার নাম হচ্ছে ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া আর এটাই হল বর্তমান ভারতীয় মতাদর্রশ বা ইন্ডিয়ান আইডিওলজি। অ্যান্ডারসন ব্রিটিশদের অধীনে নির্বাচিত সংসদের দ্বারা ভারতের সংবিধান তৈরী করাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। যে নির্রবাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৬ ভাগের ১ ভাগ। স্বাধীনতার পর একটি নির্বাচন সহজে দেওয়া যেত। আর্রমস ফোর্স ¯েপশাল পাওযার অ্যাক্টকে এখানে তীব্রভাবে সমালোচনা করা হয়েছে তাছাড়া নেহেরু ও তার পরবর্তি সরকারদের দ্বারা প্রণীত নিপীড়ন মূলক কানুন যেমন: আর্রমস ফের্রস ¯েপশাল পাওয়ার অ্যাক্ট(১৯৫৮), আনলফুল অ্যাক্টিভিটি অ্যাক্ট(১৯৬৭), প্রিভেনশান ন্যাশানাল অনার অ্যাক্ট(১৯৭১), ম্যান্টেন্যান্স অফ ইন্ডিয়া সিকিরিটি অ্যাক্টস(১৯৭১),ন্যাশানাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট(১৯৮০), টেররিজম অ্যান্ড ডিসরাপটিভ অ্যাক্টিভিটিস অ্যাক্ট(১৯৮৫), প্রিভেনশান অফ টেররিস্ট অ্যাক্ট(২০০২), আনলফুল অ্যাক্টিভিটি অ্যামেনমেন্ট অ্যাক্ট(২০০৪) ইত্যাদি। এছাড়া ইন্দিরার জরুরি অবস্থা তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে । লেখক অরবিন্দ ভার্রমার মতে টেররিজম অ্যান্ড ডিসরাপটিভ অ্যাক্টিভিটিস অ্যাক্টের আওতায় ৫৩,০০০ হাজার লোককে গ্রেফতার করা হয়েছিল কিন্তু এক বছর পরে শুধু ৪৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়।যদিও ইন্ডিয়ান অর্থনীতি ব্রিকসের দেশগুলির মধ্যে দ্বিতীয় তথাপি তার অর্থনীতি এক ধরণের অদ্ভুত প্রকৃতির। ম্যানুফেকচার এখানে সার্ভিস সেক্টরের তুলনায় অত্যন্ত দূর্রবল। জিডিপির অর্ধেক আসে সার্ভিস সেক্টর থেকে । কৃষিতে সমাজের প্রায় অর্ধেক শ্রম বিনিয়োজিত কিন্তু তা উৎপাদিত করে মোট জিডিপির পাঁচ ভাগের এক অংশ। ভারতের কৃষি আবাদি জমির পরিমাণ চীনের তুলনায় ৪০ ভাগ বেশি কিন্তু উৎপাদন চীনের তুলনায় ৫০ ভাগ কম। কর্রমমসংস্থানের শতকরা ৯০ শতাংশ এখানে হয়ে থাকে ইনফর্মাল সেক্টরের দ্বারা। ৬ থেকে ৮ ভাগ হয় ফরমাল সেক্টরের দ্বারা যেখানে দুই তৃতীয়াংশই হয়ে থাকে সরকারি চাকরীর দ্বারা। চীনের জনসংখ্যার তুলনায় ভারতের জনসংখার বৃদ্ধির হার অনেক উচ্চ। প্রতিবছর ১০ মিলিয়ন লোক কর্মক্ষেত্রে ঢুকছে কিন্তু এর বিপরীতে কাজ পাচ্ছে ৫ মিলিয়ন লোক। আইটিতে কিছু কাজের ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে তবে তা সমগ্র শ্রম বাজারের শতকরা দুই শতাংশ।ইতিমধ্যে এই বইয়ের বেশ কিছু সমালোচনা বাজারে বেরিয়েছে। অনেকে এ বইয়কে প্রশংসায় পঞ্চমুখ করেছেন যেমন অরূন্ধুতী রায়ের মতে এ বই প্রচলিত ইন্ডিয়ান আইডিওলজির উপর চপেটাঘাত। এর পক্ষে অনেক রিভিউও বেরিয়েছে। বিপরীত দিকে এর তীব্র সমালোচনামূলক লেখা বের হয়েছে যেখানে বলা হচ্ছে তিনি ভারতীয় ইতিহাসের এক প্রকার ব্রিটিশ ভাষ্য। ব্রিটিশ ভাগ কর ও শাসন কর নীতি যে ভারত বিভাগের দায়ী তা তিনি তার বইয়ে শক্ত ভাবে উল্লেখ করেননি। তার বইয়ের আরো অনেক ত্র“টি রয়েছে যেমন তিনি ভারতের নকশালবাড়ি আন্দোলনে কংগ্রেস সরকারের নিপীড়ন ও বতর্মানে চলমান সংগ্রামকে খুব ভালেভাবে উল্লেখ করেননি। তেলেঙ্গানার মত বড় সংগ্রামকে তিনি একেবারেই গুরুত্ব আরোপ করেননি। দক্ষিণ ভারতের উপর তিনি কম গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করেননি। এত কিছুর পরেও পেরি অ্যান্ডারসন তার বই ইন্ডিয়ান আইডিওলজির মাধ্যমে প্রচলিত ভারতীয় মতাদর্রশ বা ইন্ডিয়ান আইডিওলজির খুঁটির উপর এক ব্যাপক ঝাঁকুনি হেকেঁছেন।

Facebook Comments