নাফিসা তানজিম।।
হার্কিন বিল থেকে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সঃ কর্পোরেটকেন্দ্রিক শ্রম অধিকার বিষয়ক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা।।

গত কয়েক বছরে তাজরীন ও রানা প্লাজাসহ বেশ কয়েকটি ভয়ঙ্কর শিল্প দুর্যোগ ঘটার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাসমূহের কাজের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে পোশাক উৎপাদন করা কর্পোরেশানগুলো নিজেদের র্ব্যান্ড ইমেজ রক্ষার ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে। এর প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে “অ্যাকর্ড ফর বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ” ও “অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি” নামে দুটো কর্পোরেট কোড আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্ট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নতুন কিছু নয়। অতীতে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে বেশ কয়েকবার এধরণের কর্পোরেট কোড গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এই কোডগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা মহলে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে।


কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্টের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো কী কী? এই ধরণের কোড কাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়? শ্রমিকের জীবন ও কাজের পরিবেশের বস্তুগত পরিবর্তন আনতে কর্পোরেট কোড কতখানি ভূমিকা রাখতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আমি বাংলাদেশের শ্রমিকের জীবন ও কাজের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে নব্বইয়ের দশকে হার্কিন বিল পরবর্তী সময়ে গৃহীত একটি মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে প্রণীত অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের উদাহরণ বিশ্লেষণ করবো। আলোচনার মাধ্যমে আমি কর্পোরেটকেন্দ্রিক বিভিন্ন শ্রম অধিকার বিষয়ক উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা এবং এর পেছনে কাজ করা বিভিন্ন ধরণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির স্বরুপ উন্মোচন করতে চেষ্টা করবো।
শ্রমিকের কাজের পরিবেশ বিষয়ক কর্পোরেট উদ্যোগঃ নব্বইয়ের দশকের হার্কিন বিল ও গঙট হার্কিন বিল পরবর্তী সময়ে প্রণীত গঙট বাংলাদেশের শ্রমিকের জীবন ও কাজের পরিবেশের উন্নয়নে কোন ধরণের পরিবর্তন এনেছিলো, তা এথেল ব্র“কস তাঁর বই “টহৎধাবষরহম ঃযব এধৎসবহঃ ওহফঁংঃৎু: ঞৎধহংহধঃরড়হধষ ঙৎমধহরুরহম ধহফ ডড়সবহ’ং ডড়ৎশ”-এ সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ব্র“কসের আলোচনাটি নিচে সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা হলো।১৯৯২ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শিশুশ্রম ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিলো আরো অনেক আগেই। আশির দশকে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নিওলিবারেল অর্থনীতির যে সূচনা, তার ধারা অব্যাহত থাকে নব্বইয়ের দশকে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এবং প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের শাসনামলেও। নব্বইয়ের দশকের সূচনালগ্নে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বহুজাতিক কর্পোরেশানগুলোর কার্যক্রম ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসতে দেখি। তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে শ্রম সস্তা, সহজলভ্য এবং ইউনিয়নের আওতামুক্ত থাকায় কর্পোরেশানগুলো এই দেশগুলোয় উৎপাদন প্রক্রিয়া স¤পন্ন করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলে সময়ের সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমতে থাকে। নিচের তালিকা থেকে তা ¯পষ্টত প্রতীয়মান হয়ঃ
সময় কারখানায় কর্মরত আমেরিকানের সংখ্যা
১৯৫০ এক তৃতীয়াংশ আমেরিকান
আশির দশকের মাঝামাঝি ২০% আমেরিকান
নব্বইয়ের দশকের সূচনালগ্ন ১৬%আমেরিকান
তথ্যসূত্রঃ রিচার্ড বার্নেট এবং জন কাভানাহ (ব্র“কস্ ২০০৭, ৬)
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ভোক্তাগোষ্ঠী, শ্রম অধিকার সংগঠনসমূহ এবং রাজনীতিবিদেরা কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তাদের অনেকেই তৃতীয় বিশ্বের শিশুদের সস্তা শ্রমের কাছে আমেরিকানদের প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে
পারছিলেন না। এই প্রেক্ষিতে ১৯৯২ সালে মার্কিন সিনেটর টম হার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিশুশ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি বিল উত্থাপন করেন। এই বিলের উদ্দেশ্য ছিলো তৃতীয় বিশ্বে শিশুশ্রমের সহজলভ্যতার কারণে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণবয়স্ক শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বিঘিœত না হয় তা নিশ্চিত করা। মজার ব্যাপার হলো, এই বিলকেন্দ্রিক পুরো আলোচনায় বারবার তৃতীয় বিশ্বের শিশুদের কারণে কীভাবে আমেরিকানরা চাকরি হারাচ্ছে সেই বিষয়টিই বারবার উঠে আসে। ইউএসএইড মার্কিন করদাতাদের টাকা দিয়ে কীভাবে তৃতীয় বিশ্বে ইপিজেড স্থাপন করছে, তা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। কিন্তু পুরো ব্যাপারটির পেছনে যেসব কাঠামোগত কারণ দায়ী – যেমন নিওলিবারেল অর্থনৈতিক নীতি অথবা কর্পোরেট স্বার্থকে সর্বাধিকার দেয়া রাষ্ট্র – এর কোনটি নিয়েই কাউকে তেমন একটা মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি। হার্কিন বিল এবং এই বিল পরবর্তী “চাইল্ড লেবার ডেটেরেন্স অ্যাক্ট”-এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৩ সালে যেসব কর্পোরেশান ১৪ বছরের কমবয়সী বাংলাদেশী শিশুদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করে, সেসব কর্পোরেশানকে বয়কট করার জন্য ভোক্তাদের আহ্ববান জানানো হয়। এই বয়কট আন্দোলনে অংশ
নেয় আমেরিকার এএফএল-সিআইওর আন্তর্জাতিক শাখা, এশিয়ান-আমেরিকান ফ্রি লেবার ইন্সটিটিউট ও চাইল্ড লেবার কোয়ালিশানসহ আরো অনেক সংস্থা। আন্দোলনে উদারনৈতিক ও রক্ষণশীল দুই গোষ্ঠীই সমানভাবে অংশগ্রহণ করে। এদের কেউ কেউ শিশু অধিকার রক্ষার ব্যাপারে
উদ্বিগ্ন ছিলেন, আবার কারো কাছে বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই প্রধান ছিলো। ১৯৯৪ সালের শেষ নাগাদ সমগ্র আমেরিকায় বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য বয়কটের দাবী জোরদার হয়ে ওঠে।বাংলাদেশের পণ্য বয়কটের অর্থ ছিলো যেসব কর্পোরেশান বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে বাজারজাত করে সেসব কর্পোরেশানকে বয়কট করা। এই কর্পোরেশানগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো লেভি স্ট্রস এবং ওয়ালমার্ট। এদের কেউই বাংলাদেশের পণ্যের কারণে নিজেদের র্ব্যান্ড ইমেজের ক্ষতি মেনে নিতে পারেনি। বয়কটের হুমকি মোকাবিলা করা এবং নিজেদের ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্য একেক কর্পোরেশান একেক ধরণের পরিকল্পনা করে। লেভি স্ট্রস বাংলাদেশের যে পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন করছিলো, সেই কারখানাগুলোর শ্রমিকদের জন্য জন্মতারিখ উল্লেখ করা আইডেন্টিটি কার্ড বহন করা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে। ওয়ালমার্ট শুরু করে তার “মেইড ইন ইউএসএ” ক্যা¤েপইন। এই ক্যা¤েপইনের মূল উদ্দেশ্য ছিলো দূষিত বা অপরিষ্কার “বাংলাদেশ” র্ব্যান্ড থেকে যতটা সম্ভর দূরত্ব তৈরি করা এবং ভোক্তাদের মাঝে এমন একটি ধারণা তৈরি করা যে ওয়ালমার্ট শুধু বিশুদ্ধ ও পরিষ্কার “আমেরিকান” পণ্য বিক্রি করে। তার মানে কিন্তু এই নয় যে ওয়ালমার্ট বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করা পুরোপুরি বন্ধ করে দিলো। বাংলাদেশের কিছু কিছু পণ্য তখনও ওয়ালমার্টের স্টোরগুলোতে বিক্রি হতো। স্টোরের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যগুলো শুধু আলাদা করে চিহ্নিত করে দেয়া হলো।
অনেক আমেরিকান “মেইড ইন ইউএসএ” ক্যা¤েপইনকে সমর্থন জানিয়ে গাড়ির বা¤পারে “বাইং আমেরিকান” স্টিকার লাগিয়ে ঘুরতে শুরু করলেন। ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বয়কটের হুমকির মুখে বিজিএমইএ বাংলাদেশের ২০০০টি পোশাক কারখানায় কর্মরত চৌদ্দ বছরের কমবয়সী সকল শিশুশ্রমিককে কোন ধরণের ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৫ সাল নাগাদ কারখানাগুলোর অধিকাংশ শিশুশ্রমিক বরখাস্তের শিকার হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এনজিও, ইউনিয়ন এবং মানবাধিকার সংগঠনসমূহ যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী এবং বাণিজ্য সংরক্ষণনীতির প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। কিছুদিনের মধ্যে বিজিএমইএও আন্দোলনরত সংগঠনসমূহের সাথে সুর মিলিয়ে বয়কটের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে – যদিও বিজিএমইএ এবং আন্দোলনরত সংগঠনগুলোর উদ্দেশ্য ও মূলনীতি পর®পর থেকে একেবারে ভিন্ন ছিলো। এই পর্যায়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে একটি “মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং” (গঙট) স্বাক্ষর করে। গঙট এর শর্ত হিসেবে বাংলাদেশের গ্রাম এলাকার অনুকরণে শহরগুলোতে বরখাস্তকৃত শিশু পোশাক শ্রমিকদের জন্য অনানুষ্ঠানিক স্কুল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শিশুশ্রমিকদের জন্য ৩০০ টাকা হারে মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থাও করা হয়। আইএলও, ইউনিসেফ, বিজিএমইএ এবং মার্কিন দূতাবাস স্কুল পরিচালনা এবং বৃত্তির খরচ বহন করার দায়িত্ব নেয়। গঙট এর শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ করা হচ্ছে কিনা সেটি নিরীক্ষার জন্য আইএলও, বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ইন্সপেকশান টিম তৈরি করা হয়। র্ব্যাকসহ কয়েকটি স্থানীয় এনজিও স্কুলগুলো পরিচালনা করা শুরু করে। এখানে উল্লেখ্য যে গঙট স্বাক্ষরের পূর্বে বাংলাদেশে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাসমূহ বা স্থানীয় শ্রম অধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলোর কেউই গঙট বিষয়ক আলোচনায় অংশ নিতে পারে নি। আলোচনায় অংশ নিয়েছিলো শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের ভোক্তাগোষ্ঠী, বাংলাদেশের কারখানাসমূহের মালিক এবং বিজিএমইএর প্রতিনিধিবৃন্দ।পোশাকশ্রমিকদের স্কুলগুলোতে বাংলা, ইংরেজি, অংক শেখানোর পাশাপাশি নাচ, গান ও আবৃত্তি শেখানো হতো। অনেক গানে ও কবিতায় এই শিশুরা যে পোশাক কারখানার কাজে আর ফিরে যেতে চায়না সেই বিষয়টি ঘুরেফিরে আসতো। ১৯৯৭ সালের মধ্যে প্রতিশ্র“ত সবগুলো স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ৯৬০০ জন শিশু এই স্কুলগুলোয় যোগদান করে। একই বছরে মার্কিন দূতাবাস এবং ইউনিসেফ
“লার্ন টু আর্ন” বা “উপার্জনের জন্য শিক্ষা” কর্মসূচী চালু করে। এই কর্মসূচীর আওতায় চৌদ্দ বছরের বেশি বয়সী শিশুরা কোন ধরণের বৃত্তি ছাড়া দিনের অর্ধেক সময় স্কুলে পড়তে এবং বাকি অর্ধেক সময় বিজিএমইএর আয়োজনে কোন পোশাক কারখানায় কাজ করতে পারতো। স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠার আপাত উদ্দেশ্য ছিলো শিশুশ্রম বন্ধ এবং শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু “উপার্জনের জন্য শিক্ষা” কর্মসূচী স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্যকে সরাসরি ব্যাহত করে। তাছাড়া পোশাকশ্রমিকদের স্কুলগুলো জাতীয় শিক্ষাবোর্ডের অধীনে না থাকায় এই শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের কোন সুযোগ ছিলো না। ফলে স্কুলে চৌদ্দ বছর হয়ে যাওয়ার পর অনেক লিখতে পড়তে জানা শিশু আবার পোশাক কারখানাতেই যোগদান করে। আইএলওর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যেসব ইন্সপেকশান টিম বাংলাদেশের পোশাক কারখানার শিশুশ্রম পরিস্থিতি এবং পোশাকশ্রমিকদের স্কুলগুলো মনিটরিং করতো, তারা শুধু শিশুদের দিকেই নজর দিতো। কিন্ত বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে শিশুশ্রম ছাড়াও আরো অনেক ধরণের সমস্যা ছিলো এবং এখনও আছে। ইন্সপেক্টররা চাইলেও দূর্বল অগ্নি ব্যবস্থাপনা, ইউনিয়নের ওপর খবরদারি, শ্রমিক নির্যাতন বা বেতন বন্ধ রাখা নিয়ে রিপোর্ট করতে পারতেননা। ইন্সপেকশান শিটে শিশুশ্রম ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কিছু লেখার জায়গা ছিলো না। এই সীমাবদ্ধতাগুলো থাকা সত্ত্বেও ইউনিসেফ, আইএলও, বাংলাদেশ সরকার এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশকে শিশুশ্রম নিরোধের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে। সিনেটর হার্কিন ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে শিশুশ্রমরোধে বিজিএমইএর উদ্যোগ এবং গঙটএর ব্যাপক প্রশংসা করেন।শিশুশ্রম বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের একমাত্র সমস্যা নয়। আবার বাংলাদেশের কর্মজীবী শিশুরা শুধু পোশাক কারখানায় কাজ করে না। এথেল ব্র“ক্স তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের শিশুশ্রমিকদের মাত্র ৪ শতাংশ পোশাকশিল্পের মত আনুষ্ঠানিক সেক্টরে কাজ করে। এই ৪ শতাংশ শিশুর জন্য আইএলও লাখ লাখ ডলার খরচ করেছে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে কাজ করা বাকি ৯৬% শিশুশ্রমিকদের জন্য আইএলওর বরাদ্দ ছিলো মাত্র ৬ লাখ ডলার। আন্তর্জাতিক মহলে পোশাকশিল্পে শিশুশ্রম বিষয়ক বিতর্কে বাংলাদেশের দারির্দ্যসীমার নিচে বসবাস করা পরিবারগুলোকে কেন শিশুশ্রমের ওপর নির্ভর করতে হয় তা নিয়ে কখনও আলোচনা হয়নি। পোশাক কারখানার চেয়েও মানবেতর পরিবেশে যেসব শিশুশ্রমিকরা কাজ করে তাদের অধিকার নিয়ে ভোক্তাগোষ্ঠী, কর্পোরেশান বা আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের কেউই কোন কথা বলেনি (ব্র“কস, ২-২৩)।
শ্রমিকের কাজের পরিবেশ বিষয়ক কর্পোরেট উদ্যোগঃ
একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স২০১২ সালের ২৪শে নভেম্বরে তাজরীন ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকান্ড এবং ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিলে রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ার পর আমরা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের শ্রম এবং শ্রমিকের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক উদ্বিগ্নতা লক্ষ্য করি। বাংলাদেশে পোশাক উৎপাদন করা অনেক কর্পোরেশান এদেশের পোশাকশ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। এমন কিছু কর্পোরেট উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো “অ্যাকর্ড ফর বিল্ডিং অ্যান্ড সেফটি ইন বাংলাদেশ” এবং “অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি”।

অ্যাকর্ড ফর বিল্ডিং অ্যান্ড সেফটি ইন বাংলাদেশ
২০১৪ সালের মে মাসের ২৩ তারিখে “অ্যার্কড ফর বিল্ডিং অ্যান্ড সেফটি ইন বাংলাদেশ” (সংক্ষেপে “বাংলাদেশ অ্যাকর্ড”) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। প্রাথমিকভাবে ক্লিন ক্লথ ক্যাপ্লেইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক নামে দুইটি আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশের চারটি ইউনিয়ন ফেডারেশান এবং ৪০ টিরও বেশি কর্পোরেশান এই অ্যাকর্ডে স্বাক্ষর করে। চারটি শ্রম অধিকার সংগঠন অ্যাকর্ড স্বাক্ষরের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উপস্থিত ছিলো। অ্যাকর্ড স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ইন্সপেকশান, শ্রমিক স্বাস্থ্য, কাজের পরিবেশ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি রোধে আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং প্রতিশ্র“তি পূরণে ব্যর্থ হলে কর্পোরেশানকে দায়ী করার উদ্যোগ নেয়। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল, আইএলও এবং অর্গানাইজেশান ফর ইকনমিক কোঅপারেশানসহ আরো বেশ কিছু সংগঠন অ্যাকর্ডের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। স্বাক্ষর করা কর্পোরেশানগুলো বাংলাদেশে অগ্নি এবং ইমারত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদী উদ্যোগ নেবে। যে কর্পোরেশানগুলো অ্যাকর্ডে স্বাক্ষর করেছে তাদের বেশিরভাগই ইউরোপিয়ান র্ব্যান্ড। এই ব্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে বেনেটন, এইচ অ্যান্ড এম, ই¯িপরিট, যারা, মার্কস অ্যান্ড ¯েপন্সার ইত্যাদি। আইএলওর তত্ত্বাবধানে অ্যাকর্ডটি বাস্তবায়িত হবে (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক ২০১৩, ১)।

মূলবক্তব্যঃ
বাংলাদেশ অ্যাকর্ডের মোট ২৫ টি ধারা আছে। এই ধারাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলোঃ
– বর্তমানে প্রচলিত কো¤পানি নিয়ন্ত্রিত কারখানার মনিটরিং ব্যবস্থ্রা নানা ধরণের দুর্বলতা আছে। বাংলাদেশ সরকারও শ্রম আইন বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখাতে পারেনি। এই প্রেক্ষিতে অ্যাকর্ড একজন নিরপেক্ষ ইন্সপেক্টরকে কারখানা পরিদর্শনের দায়িত্ব দেবে।
– পরিদর্শনের ফলাফল ও পরবর্তী কর্ম পরিকল্পনা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে। এতে করে কারখানাগুলোর ওপর কাজের পরিবেশের উন্নয়নের জন্য চাপ তৈরি হবে।
– উৎপাদনের ক্ষমতা অনুযায়ী ফ্যাক্টরিগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে স¤পূর্ণ ইন্সপেকশান ও ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করা হবে। তৃতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে পূর্ণ ইন্সপেকশান করা হবে কিন্তু কোন ট্রেনিং প্রদান করা হবে না।
– স্টিয়ারিং কমিটি শ্রমিক ও ম্যানেজারদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক ট্রেনিং প্রদানের জন্য একজন ট্রেনিং কোঅর্ডিনেটর নিয়োগ করবে। এই উদ্যোগে বাংলাদেশের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
– শ্রমিকরা যাতে কোন ধরণের ভয়-ভীতি ছাড়া অনিরাপদ কর্মপরিবেশে কাজ করতে অসম্মতি প্রকাশ করতে পারে তা নিশ্চিত করা হবে।
– কারখানাগুলোতে শ্রমিক ও ম্যানেজমেন্টের সমন্বয়ে যুগ্ম স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কাজ করবে।
– বায়াররা পণ্যের এমন কোন দাম নির্ধারণ করতে পারবে না যা চিফ ইন্সপেক্টরের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কারখানাগুলোর পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগকে অসম্ভব করে তুলবে।
-সংস্কারকাজ পরিচালনার জন্য যদি কোন কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তবে কো¤পানিগুলো সাপ্লায়ারকে পরবর্তী ছয় মাস শ্রমিকদের চাকরি বহাল রাখতে ও বেতন দিতে বাধ্য করবে। যদি কোন ফ্যাক্টরি কর্মপরিবেশ পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে কো¤পানিগুলো
শ্রমিকদের অন্য কোন ভালো পরিবেশের কারখানায় কাজ খুঁজতে যৌক্তিকভাবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সাহায্য করবে।
– ইন্সপেকশান প্রোগ্রাম পরিচালনার জন্য যে স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হবে, সেখানে শ্রমবিষয়ক সংগঠন এবং কো¤পানিসমূহ সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করবে।
– আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিশের মডেলে একটি আইনগত মতবিরোধ নিরসনের প্রক্রিয়া গঠন করা হবে। কোন মতবিরোধ হলে প্রথমে স্টিয়ারিং কমিটি সেটি নিরসনের চেষ্টা করবে। স্টিয়ারিং কমিটি ব্যর্থ হলে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন কমিশনের নীতি অনুযায়ী আইনানুগ শালিস হবে। শালিশের সিদ্ধান্ত কোর্ট বা যথাযথ আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক ২০১৩, ৪-৬)।

অ্যাকর্ড ফর বিল্ডিং অ্যান্ড সেফটি ইন বাংলাদেশ-এর বৈশিষ্ট্যঃ
অন্যান্য কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্ট থেকে বাংলাদেশ অ্যাকোর্ড বিভিন্ন দিক থেকে আলাদা। যেমনঃ
– বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরের বিভিন্ন শ্রম অধিকার সংগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়নসহ বায়ার, সাপ্লায়ার ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিবৃন্দ অ্যাকর্ড প্রণয়ণের নানা পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন। কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্টের ক্ষেত্রে এমনটি সচরাচর দেখা যায় না।
– কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্ট বাস্তবায়ন করতে কর্পোরেশানগুলো আইনগতভাবে বাধ্য থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশ অ্যাকর্ড কর্পোরেশানগুলোকে কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনগতভাবে বাধ্য করে।
– কো¤পানির কোড অফ কন্ডাক্টের যে অনিয়ন্ত্রিত ধারাটি অনেকদিন ধরে চলে এসেছে, সেটি বাংলাদেশের কারখানাগুলোর কাজের পরিবেশের পরিবর্তন ঘটাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাকর্ড একজন নিরপেক্ষ ইন্সপেক্টরকে কারখানা নিরীক্ষণের দায়িত্ব দেয়। তাই আশা করা হচ্ছে যে এটি পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নিরীক্ষণ নিশ্চিত করবে।
– অনেকসময় বায়াররা নিরাপত্তাজনিত কারণে অর্ডার বাতিল করে দেন। কিন্তু তারা ইন্সপেকশানের রিপোর্ট প্রকাশ না করায় কারখানাগুলো নিরাপত্তা পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন না এনে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে। অ্যাকর্ডের ধারা অনুযায়ী ইন্সপেক্টর সবধরণের ইন্সপেকশানের রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করতে বাধ্য থাকবেন।
– কো¤পানিগুলো চাইলেই নিরাপত্তা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে অর্ডার বাতিল করে দায় এড়াতে পারবে না। তারা প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে কমপক্ষে পরবর্তী দুই বছর কাজের অর্ডার দিতে বাধ্য থাকবে (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক ২০১৩, ৪-৬)।

সীমাবদ্ধতাঃ
গতানুগতিক কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্ট থেকে কিছুটা আলাদা হলেও বাংলাদেশ অ্যাকর্ড কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নয়নের জন্য কোন ম্যাজিক বুলেট হিসেবে কাজ করবে না। অ্যাকর্ড প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে কো¤পানি ও ইউনিয়নের পার®পরিক সহযোগিতার কথা বার বার বলা হলেও অ্যাকর্ড অনেকক্ষেত্রে কো¤পানির স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। নিচে অ্যাকর্ডের বিভিন্ন ধারা স¤পর্কে শ্রম আন্দোলনের কর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনসমূহ যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তা আলোচনা করা হলো।বাংলাদেশের প্রচলিত শ্রম আইন কারখানার অবস্থা পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয় – এটি ধরে নিয়ে অ্যাকর্ডের উদ্যোক্তারা একটি প্রাইভেট আইনপ্রয়োগকারী কাঠামো গড়ে তুলছেন। রাষ্ট্রের শ্রম আইন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কীভাবে আরো দক্ষ ও কার্যকর করে তোলা যায় সেটি অ্যাকর্ডের বিবেচ্য বিষয় নয়। অ্যাকর্ড প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের আশঙ্কাজনক অভাব দেখা গেছে। ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্কের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সালে অ্যাকর্ড প্রণয়নের প্রারম্ভিক পর্যায়ের একটি মিটিং-এ বায়ার, পোশাক কারখানা, ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রম অধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কেউই অংশ নেননি। ২০১১ সালে “দ্যাটস ইট ¯েপার্টস ওয়্যার” কারখানাসহ আরো কয়েকটি কারখানায় অগ্নিকান্ডের পর এপ্রিল মাসে ঢাকায় বাংলাদেশী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইউনিয়ন, এনজিও, আন্তর্জাতিক র্ব্যান্ড ও রিটেইলার এবং বিজিএমইএর একটি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। এই মিটিং-এ বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে ফায়ার সেফটি ডিপার্টমেন্ট এবং বিল্ডিং ও ফ্যাক্টরি ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন নীতি নির্ধারক মহলকে অ্যাকর্ড ড্রাফটের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নিতে ততটা দেখা যায় নি। বাংলাদেশের ৫০০০-এরও বেশি পোশাক কারখানাকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় – এই তিনটি টায়ারে ভাগ করা হয়। এদেশের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ কারখানা তৃতীয় টায়ারের মধ্যে পড়ে। তৃতীয় টায়ারের কারখানাগুলোয় সাধারণত ৫০ এর কম সংখ্যক কর্মী দিয়ে ৮টি প্রোডাকশান লাইনে সর্বনিু প্রযুক্তির সহায়তায় পোশাক তৈরি করা হয়। এদের বেশিরভাগ সাব-কন্ট্রাকটর হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এরা অন্যান্য মাঝারি বা বড় আকারের স্থানীয় কারখানার কাছ থেকে কাজের অর্ডার নেয়। আন্তর্জাতিক বায়ারদের সাথে তৃতীয় টায়ারের কারখানাগুলোর কোন সরাসরি যোগাযোগ নেই। এই কারখানাগুলোর গড়পরতা কাজের পরিবেশ প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানার চেয়ে অনেক নিুমানের হয়। কাজের জন্য উন্নতমানের পরিবেশ রক্ষার পেছনে কম অর্থ ব্যয় করতে হয় বলে প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের
কারখানার উৎপাদন খরচের চেয়ে তৃতীয় টায়ারের উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫% শতাংশ কম (বিয়ারনট)। অ্যাকর্ড প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে পূর্ণ ইন্সপেকশান ও ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করবে। তৃতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে শুধু ইন্সপেকশান করা হবে; কোন ধরণের ট্রেনিং দেয়া হবে না। অথচ তৃতীয় টায়ারের এই কারখানাগুলো সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বায়ারদের চাহিদার বিশাল অংশ পূরণ করে থাকে (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৫)। অ্যাকর্ড অনুযায়ী যেসব কারখানাকে সংস্কার প্রকল্পের আওতায় আনা হবে তাদের পূর্ণ তালিকা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু যে বায়াররা এই কারখানাগুলোতে উৎপাদন করছিলো, তাদের নাম প্রকাশ করা হবে না (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৫)। অ্যাকর্ড অনুযায়ী বায়ারদেরকে তাদের সাব-কন্ট্রাক্টরদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু বায়ারদের প্রকাশিত তথ্য সঠিক কিনা তা যাচাই করার কিংবা কোন দুর্ঘটনার সময় আইনগত দায়বদ্ধতা কে বহন করবে তা নির্ধারণ করার জন্য কোন সু¯পষ্ট দিক নির্দেশনা অ্যাকর্ডে নেই (বিয়ারনট)।কোন কারখানা ইন্সপেকশান, সংস্কার বা ট্রেনিং প্রোগাম চালু করার ব্যাপারে যথাযথ সহযোগিতা করতে না পারলে নোটিশ এবং ওয়ার্নিং দেয়া হবে। এর পরেও কাজ না হলে কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হবে (মারিয়ান ২০১৩)। অ্যাকর্ড অনুযায়ী কোন কারখানা চাইলে সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীর অর্থের বিকল্প উৎস, যেমন – যুগ্ম বিনিয়োগ, ঋণ, সরকারি বা দাতাদের সহযোগিতা ইত্যাদি অনুসন্ধান করতে পারে (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৫)। কিন্তু অ্যাকর্ড র্ব্যান্ডগুলোকে কারখানা সংস্কারের খরচ বহনের দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি দিয়েছে। অ্যাকর্ডে স্বাক্ষর করা র্ব্যান্ডগুলো প্রতি বছর স্টিয়ারিং কমিটি, সেফটি ইন্সপেক্টর ও ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটরের জন্য ৫০০,০০০ মার্কিন ডলার প্রদান করবে। কিন্তু কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নয়নের জন্য কোন ধরণের আর্থিক সহায়তা প্রদানে বা আর্থিক সহায়তার উৎস খোঁজায় সাহায্য করতে তারা বাধ্য নয়। অ্যাকর্ডে বলা হয়েছে স্বাক্ষরকারী কো¤পানিগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোতে পরবর্তী দুই বছর কাজের অর্ডার দিবে। কিন্তু কো¤পানিগুলো নিঃশর্তভাবে অর্ডার বহাল রাখতে বাধ্য নয়। তারা ততক্ষণ পর্যন্তই কাজের অর্ডার দেবে রাখবে যতক্ষণ কারখানাগুলো অ্যাকর্ড অনুযায়ী নিজেদের করণীয় কর্তব্যসমূহ সঠিকভাবে পালন করবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি অর্ডারকারী কো¤পানির জন্য লাভজনক হবে (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৫-৬)। অ্যাকর্ড অনুযায়ী যদি কারখানা সংস্কারকাজের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়, তবে পরবর্তী ছয় মাস সাপ্লায়াররা কারখানার কর্মীদের চাকরি ও বেতন বহাল রাখতে বাধ্য থাকবে (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৬)। চাকরি ও বেতন বহাল রাখার খরচ বহন করবে সাপ্লায়ার, কো¤পানি নয়। সংস্কার কাজে ছয় মাসের বেশি সময় লাগলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, সে ব্যাপারে অ্যাকর্ডে পরিষ্কার করে কিছু বলা নেই। অ্যাকর্ডে আরো বলা হয়েছে যে কর্মপরিবেশ পরিবর্তনে ব্যর্থ হওয়ার জন্য যদি কোন কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তবে কো¤পানি পোশাককর্মীদের অন্য কারখানায় কাজ খোঁজার ব্যাপারে “যৌক্তিক”ভাবে (ৎবধংড়হধনষব) সাহায্য করতে চেষ্টা করবে (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৬)। কতখানি চেষ্টা করা যৌক্তিক, সেটি ঠিক করবে স্বাক্ষরকারী কো¤পানি। যেসব ক্ষেত্রে একটি কারখানায় অনেকগুলো কো¤পানি উৎপাদন করে, সেসব ক্ষেত্রে কীভাবে কো¤পানিগুলো নিজেদের মাঝে শ্রমিকদের সাহায্য করার দায়িত্বটি ভাগ করে নেবে তা পরিষ্কার নয় (ব্যারি ২০১৩)। “বাংলাদেশ ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি অ্যাকর্ড” (ইঋইঝঅ) নামে ২০১২ সালের একটি চুক্তির অনেকগুলো ধারা অ্যাকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইঋইঝঅ তে এনজিওরা স্বাক্ষরকারী হিসেবে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু ২০১৩ সালে এনজিওদের প্রত্যক্ষদর্শীর ভূমিকায় রেখে পুরো অ্যাকর্ডটি স্বাক্ষরিত হয় ট্রেড ইউনিয়ন ও কো¤পানিদের মধ্যে। ইঋইঝঅ কো¤পানিকে প্রস্তাবিত শর্ত বাস্তবায়নের জন্য দুই বছর সময় দিলেও কো¤পানিদের অনুরোধে অ্যাকর্ডে এই সময়সীমা দুই বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয় (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৬)। কো¤পানি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত মনিটরিং-এ কো¤পানি নিজের ইচ্ছামত নিয়ম-কানুন ও মানদন্ড নির্ধারণ করে। একারণে এধরণের মনিটরিং-এ স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নের অংশগ্রহণের অভাব থাকে। ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্কের রিপোর্টে বলা হয় যে কো¤পানি নিয়ন্ত্রিত মনিটরিং ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার কারণে অ্যাকর্ডের উদ্যোগটি নেয়া হয়। কিন্তু অ্যাকর্ড কো¤পানি নিয়ন্ত্রিত মনিটরিং-এর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বাতিল করে দিচ্ছে না। অ্যাকর্ডে বলা হয়েছে, যদি কো¤পানির ইন্সপেকশান অ্যাকর্ডের মানদন্ড মেনে চললে নিরপেক্ষ সেফটি ইন্সপেক্টর কো¤পানির ইন্সপেকশানের রিপোর্ট গ্রহণ করতে পারবেন (ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন ও ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ৬)। বাংলাদেশ অ্যাকর্ডটি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু বাংলাদেশে যে ধরণের শিল্প দুর্যোগ ঘটে থাকে, সে ধরণের দুর্যোগ পাকিস্তান, ভারত, কম্বোডিয়াসহ আরো অনেক দেশেই ঘটেছে। সুতরাং বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অ্যার্কডটির প্রভাব অত্যন্ত গৌণ। ভারতের ব্যাঙ্গালরে শ্রমিক
নিরাপত্তাবিষয়ক অ্যাক্টিভিস্ট রাশমি ভেঙ্কাটাসেনের মতে, বায়ারদের অবশ্যই তাদের সাপ্লাই চেইনে শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। তবে যেসব কারখানা স্থানীয় বা অপেক্ষাকৃত কম বিখ্যাত আঞ্চলিক পরিবেশকের জন্য কাজ করে, অ্যাকর্ডের মত চুক্তিগুলো সেসব কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখে না (মরের ২০১৩)।কোন কো¤পানি বাংলাদেশ অ্যাকর্ডের মানদন্ড মেনে চলতে না চাইলে তাকে অ্যাকর্ড মানতে বাধ্য করার কোন পদ্ধতি নেই। আবার যেসব কো¤পানি বাংলাদেশে কখনো উৎপাদন করেনি, তারা চাইলে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে অন্য কোন দেশে উৎপাদন করতে পারে যেখানে অ্যাকর্ডে উল্লিখিত শর্ত রক্ষার ব্যাপারে কোন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ নেই। পিটার মারিয়ানের রিপোর্ট অনুযায়ী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্তব্য করেছেন যে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির প্রেক্ষিতে অ্যাকর্ড সফল হবে কি হবে না তা অনেকটাই একেকটি কারখানা ও সংগঠনের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে (মারিয়ান ২০১৩)।

অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স সেফটি
অ্যাকর্ড ফর বিল্ডিং অ্যান্ড সেফটি ইন বাংলাদেশ স্বাক্ষরের দু’দিন পরে “অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি” নামে পাঁচ বছর মেয়াদী আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওয়ালমার্ট ও গ্যাপের নেতৃত্বে ও আরো কিছু মার্কিন কর্পোরেশানের উদ্যোগে অ্যালায়েন্স ঘোষণা করা হয়। অ্যালায়েন্স বাংলাদেশের কারখানাগুলোর ভবন সংস্কারের জন্য ২৫০ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা প্রদান ও আরো ১০০ মিলিয়ন ডলার স্বল্প সুদে ঋণ হিসেবে দেয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছে (মরের ২০১৩)। অ্যালায়েন্স স্বাক্ষরকারী কর্পোরেশানসমূহের ব্যবহৃত কারখানাগুলোতে এক বছরের মধ্যে ইন্সপেকশান স¤পন্ন করে একটি সর্বজনীন নিরাপত্তাবিষয়ক মানদন্ড তৈরি করবে (ম্যাকলে ২০১৩)।অ্যালায়েন্সটি চিলড্রেনস প্লেস, গ্যাপ, হাডসন’স বে, জেসি পেনি, কোলস, এল এল বিন, মেসি’স, নর্ডস্ট্রম, সিয়ার্স ও টার্গেটসহ উত্তর আমেরিকার বেশকিছু বিখ্যাত র্ব্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করে। অ্যালায়েন্সকে সমর্থন জানিয়েছে অ্যামেরিকান অ্যাপারাল ও ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশান, কানাডিয়ান অ্যাপারেল ফেডারেশান, ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশান, রিটেইল কাউন্সিল অফ কানাডা, রিটেইল ইনডাস্ট্রি লিডারস অ্যাসোসিয়েশান এবং ইউনাইটেড স্টেটস অ্যাসোসিয়েশান অফ ইমপোর্টারস অফ টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারাল (মরের ২০১৩)।

মূলবক্তব্যঃ
– নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ জানানোর একটি কার্যকরী, অভিন্ন ও বেনামী হটলাইন চালু করার উদ্দেশ্যে বেজলাইন সার্ভে করা।
– অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তা, ট্রেনিং ও শ্রমিকদের ক্ষমতায়নবিষয়ক কাজ ও অগ্রগতিবিষয়ক অর্ধবার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করা।
– ম্যানেজমেন্টের সাথে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য প্রতিটি অংশগ্রহণকারী কারখানাতে শ্রমিকদের অংশগ্রহণে কমিটি তৈরি করা।
– কারখানার শ্রমিক, সুপারভাইজার ও ম্যানেজমেন্টকে ট্রেনিং দেয়ার জন্য একটি সর্বজনীন অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তা বিষয়ক শিক্ষামূলক মানদন্ড ও কারিকুলাম তৈরি করা।
– নিরাপত্তা নিরীক্ষণের মানদন্ড তৈরির জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা। এই কমিটিটি যোগ্য ইন্সপেক্টরদের অনুমোদন দেবে, প্রতিকারের পরিকল্পনা করবে, কোন কারখানাগুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিরীক্ষণ করা হবে তা ঠিক করবে, ইন্সপেকশানের রিপোর্ট অডিট ও অনুমোদন করবে এবং সংশোধণের উদ্যোগ ঠিকমত নেয়া হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করবে।
– অনুনোমোদিত সাবকন্ট্রাক্ট দেয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা (মরের ২০১৩)।গুন্থারের মতে বাংলাদেশের শ্রমিকের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব কার সেই প্রশ্নে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স ভিন্ন ভিন্ন নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করে। অ্যাকর্ড মূল দায়িত্ব অর্পণ করে কর্পোরেশানদের ওপর। অপরদিকে অ্যালায়েন্স মনে করে বাংলাদেশের সরকার ও কারখানার মালিকদেরকেই এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে (গুন্থার ২০১৩)।

সীমাবদ্ধতাঃ
অ্যাকর্ড ফর বিল্ডিং অ্যান্ড সেফটি ইন বাংলাদেশের সমর্থকেরা অ্যালায়েন্সের পরিকল্পনার ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে অ্যালায়েন্স অ্যাকর্ডের তুলনায় একটি অত্যন্ত দুর্বল চুক্তি। শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে কোনরকম আলোচনা না করে এই অ্যালেয়েন্স গঠন করা হয়েছে। অতীতে অ্যালায়েন্সের মত কো¤পানি নিয়ন্ত্রিত অডিট স্কিমগুলো বারবার ব্যর্থ হয়েছে। অ্যাকর্ডের সমর্থকেরা অভিযোগ করেছেন, অ্যাকর্ড কো¤পানিগুলোকে যে দায়িত্ববান ভূমিকা নিতে বাধ্য করবে, ওয়ালমার্ট ও গ্যাপের মত কর্পোরেশানগুলো সেই ভূমিকা পালন করতে অনিচ্ছুক। একারণে এই কর্পোরেশানগুলো নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী অ্যালায়েন্সের মত একটি একপাক্ষিক ও অস্বচ্ছ উদ্যোগ নিয়েছে। অ্যালেয়েন্স শ্রমিকদের ইউনিয়ন করবার বা অনিরাপদ কর্মপরিবেশ বর্জনের কোন অধিকার দেয় না। এটি র্ব্যান্ড ও পরিবেশকদের কারখানার পরিবেশের উন্নয়নের জন্য অর্থব্যয় করতেও আইননঙ্গতভাবে বাধ্য করে না (মরের ২০১৩)। ওয়ার্কার রাইটস কনসর্শিয়ামের নির্বাহী পরিচালক স্কট নোভার মতে অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে ওয়ালমার্ট তাদের ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোর তালিকা প্রকাশ করে একটি প্রশংসনীয় কাজ করেছে কারণ বেশিরভাগ পরিবেশক ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার নাম প্রকাশ করতে চাননা। কিন্তু ওয়ালমার্টের রিপোর্টে কারখানায় নির্দিষ্ট কোন ধরণের ঝুঁকি রয়েছে তা উল্লেখ করা নেই। ফলে ইন্সপেকশান এই রিপোর্ট অপর্যাপ্ত (গ্রিনহাউস ২০১৩)। নোভা মনে করেন যে, অ্যালায়েন্স মূলত কর্পোরেশান ও কারখানার মালিকদের স্বনিয়ন্ত্রণের পন্থা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করছে এবং নিজেকে অ্যাকর্ডের একটি বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। কিন্তু অ্যালায়েন্সের এই উদ্যোগটি যুগ যুগ ধরে চলে আসা কর্পোরেশানের অন্যান্য অসফল প্রয়াস থেকে কোনভাবেই আলাদা নয় (শ্যায়ন ২০১৩)। কর্পোরেশান কারখানার মালিক না হলেও এবং কারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা সত্ত্বেও অ্যাকর্ড অনুযায়ী কারখানার পরিবেশের জন্য কর্পোরেশানকে আর্থিক ও আইনগতভাবে দায়ী করা সম্ভব। গ্যাপের নিবার্হী কর্মকর্তাগণ সু¯পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে এই কারণে তারা অ্যাকর্ডের চেয়ে অ্যালায়েন্সকে শ্রেয় বলে মনে করেন (গুন্থার ২০১৩)। ওয়ালমার্টের মতে কারখানার কর্মপরিবেশের মূল দায়িত্ব নেয়া উচিত পোশাক রফতানিকারী দেশের সরকার ও সাপ্লায়ারদের। অ্যাকর্ডের মত একটি আইনগতভাবে বাধ্যকারী চুক্তি কারখানার অগ্নি ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য অপ্রয়োজনীয় (ব্যারি ২০১৩)। অ্যালায়েন্সকে যেভাবে অনেক কর্পোরেশান অ্যাকর্ডের একটি বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে তার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ওয়ার অন ওয়ান্ট সংগঠনের মুরে ওর্দি বলেন, “গ্যাপ ও ওয়ালমার্টের পরিকল্পনা একটি অজুহাত। এটি কারখানাগুলোকে কখনোই নিরাপদ করবে না। বরং এটি বাংলাদেশ সেফটি অ্যাকর্ডকে অবমাননা করবে। অ্যালায়েন্স শুধু আরেকটি নতুন কর্পোরেট শাসিত স্বেচ্ছাপ্রণদিত উদ্যোগ – যে ধরণের উদ্যোগ রানা প্লাজার মত দুর্যোগ মোকাবিলায় সু¯পষ্টভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গ্যাপ, ওয়ালমার্ট ও অ্যালায়েন্সের পেছনের র্ব্যান্ডগুলোকে অবশ্যই এই ব্যয়বহুল পাবলিক রিলেশানের চমক পরিত্যাগ করে পোশাক শিল্পের অন্যান্য র্ব্যান্ডের মত অ্যাকর্ডের সাথে যুক্ত হতে হবে। কারণ অ্যাকর্ড কর্পোরেশানকে আইনগতভাবে শর্তাবদ্ধ করে বাংলাদেশের শ্রমিকের জীবন বাঁচাতে সক্ষম (ম্যাকলি ২০১৩)”। যদি কোন কর্পোরেশান অ্যালায়েন্সে স্বাক্ষর করার পর সরে যেতে চায়, তবে তাকে শুধুমাত্র প্রশাসনসংক্রান্ত ব্যয় বহন করা ছাড়া অন্য কোন ধরণের জরিমানা দিতে হবে না। এএফএল-সিআইওর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড ট্রামকা উল্লেখ করেন, যেসব কো¤পানি স্বাক্ষর করার পর অ্যালায়েন্সের প্রতিশ্র“তি পূরণে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে অ্যালায়েন্স থেকে বহিষ্কার করা ছাড়া আর কোন পদক্ষেপ নেয়া হবে না। এভাবে অ্যালায়েন্স প্রমাণ করে যে ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও তাদের মত অন্যান্য কো¤পানি পূরণ করতে হবে এমন কোন প্রতিশ্র“তি দিতে আগ্রহী নয়। তারা জনগণ ও মিডিয়ার কঠোর নিরীক্ষণের মুখে এমন প্রতিশ্র“তি দিতে চায় যা থেকে পরবর্তীতে নামেমাত্র মূল্য দিয়ে সুবিধামত সরে আসা সম্ভব। ট্রামকা আরো বলেন, অ্যালায়েন্সে যে “ওয়ার্কার পার্টিসিপেশান কমিটি”র প্রস্তাব করা হয়েছে তা শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নে যোগদান করে সংগঠিত হতে নিরুৎসাহিত করবে (ম্যাকলি ২০১৩)। অ্যাকর্ডের মত অ্যালায়েন্সও শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানার নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য আর্থিক বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। কিন্তু বাংলাদেশের যে বিপুল সংখ্যক কারখানা আন্তর্জাতিক বায়ারদের সাথে সরাসরি কাজ করে না সেসব কারখানা বরাবরের মত সব ধরণের উদ্যোগের বাইরে থেকে যাবে (বিয়ারনট)। ভারতের শ্রম অ্যাক্টিভিস্ট ভেঙ্কাটাসেন মন্তব্য করেছেন, “এদের (অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স) প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরণের কারণে বাস্তবায়ন সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়া¡ে (মরের ২০১৩)।”বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের
কার্যকারিতার ব্যাপারে সন্দিহান। ২০১৪ সালে বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার এবং অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নিয়োযিত ইঞ্জিনিয়ারদের মাঝে কারখানার ভবনের কংক্রিটের পিএসআই কত হওয়া উচিত তা নিয়ে মতদ্বৈততা সৃষ্টি হয়। অ্যাকর্ড কারখানার জন্য যে পিএসআই সুপারিশ করে তা মেনে চলতে গেলে বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে (ঢাকা ট্রিবিউন, ১৪ মে ২০১৪)। পরিশেষে আইএলওর মধ্যস্থতায় অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ারদের পিএসআই বিষয়ক সুপারিশ মেনে নেয় (ঢাকা ট্রিবিউন, ১৬ মে ২০১৪)। একই বছরের মে মাসে অ্যালায়েন্সের সাথে আয়োজিত একটি মিটিং-এ বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক নেতা অ্যালায়েন্সের একের পর এক কারখানা বন্ধ করে দেয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইঘএডঊখ এর প্রেসিডেন্ট সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন যে প্রায় ১০০০০ জন শ্রমিক ইন্সপেকশানের কারণ বেকার হয়ে পড়েছে। কিন্তু কারখানা বন্ধ হওয়া বা সংস্কারকাজের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা সত্ত্বেও অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সের কেউই শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়নি। বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশানের জেনারেল সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন খান অ্যালেয়েন্সকে দু’মাসের পরিবর্তে ছয় মাস ধরে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আহ্ববান জানান (ঢাকা ট্রিবিউন, ১৬ মে ২০১৪)। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিএমইএর একজন ডিরেক্টর বলেন, “অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স ফ্যাক্টরি ইন্সপেকশানের জন্য হাজার হাজার ডলার খরচ করছে কিন্তু ফ্যাক্টরি সংস্কারের কোন খরচ বহন করছে না (ঢাকা ট্রিবিউন, ৬ মে ২০১৪)। ঢাকা ট্রিবিউনের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৪ সালের মে মাস পর্যন্ত অ্যালায়েন্স সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকদের দুই সপ্তাহ ধরে অর্ধেক বেতন প্রদান করলেও অ্যাকর্ড কোন ধরণের আর্থিক সহায়তা প্রদান করেনি (ঢাকা ট্রিবিউন, ৬ মে ২০১৪)। ২০১৪ সালের মে মাসে অ্যাক্টিভিস্ট নৃবিজ্ঞানী আয়োযিত একটি সেমিনারে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভানেত্রী মোশরেফা মিশু বলেন, “আমরা দেখবো অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স আমাদের কোথায় নিয়ে যায়। র্ব্যান্ডগুলো এতদিন ধরে এদেশের কাজের পরিস্থিতি নিয়ে কোনরকম মাথা ঘামায়নি। র্ব্যান্ড ইমেজ রক্ষার প্রশ্ন ওঠার পরেই এখন তারা কাজের পরিবেশ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের সব সিদ্ধান্ত একচ্ছত্রভাবে নেয়া উচিত নয়। কারখানা বন্ধ করা হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ায় আমাদের কারখানার মালিক, শ্রমিক ও সরকারকে অংশ নিতে দিতে হবে”।

কর্পোরেটকেন্দ্রিক শ্রম আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা
নব্বইয়ের দশকের হার্কিন বিল ও গঙট অথবা একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কারখানার মালিক, শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের মাঝে তৈরি হওয়া উদ্বেগ কর্পোরেটকেন্দ্রিক শ্রম আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাকে মূর্ত করে তোলে। নাওমি ক্লেইন তাঁর “নো লোগো” বইয়ে র্ব্যান্ড এবং কর্পোরেটকেন্দ্রিক শ্রম আন্দোলনের সমালোচনা করতে গিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। ক্লেইনের আলোচনের প্রেক্ষিতে এবং হার্কিন বিল-অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের উদাহরণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের শ্রম আন্দোলনে কর্পোরেট হস্তক্ষেপের প্রভাব নিচে বিশ্লেষণ করা হলো। কর্পোরেশন প্রণীত বিভিন্ন কোড অফ কনডাক্ট, মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং, কোড অফ এথিক্স বা কোড অফ প্রিন্সিপাল র্ব্যান্ডনির্ভর আন্দোলনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। ব্র“কসের আলোচনায় হার্কিন বিল পরবর্তী সময়ে প্রণীত গঙটএর সীমাবদ্ধতার বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। গঙট বা অ্যালায়েন্সের মত কোড অফ কনডাক্টগুলোতে সাধারণত আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই কোডগুলো খুব কম সময়েই শ্রমিকদের সাথে সরাসরি আলোচনা করে প্রণয়ন করা হয়। কর্পোরেশানের পাবলিক রিলেশান ডিপার্টমেন্টগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের মত করে এসব কোড তৈরি করে। তাদের সহযোগিতা করে পশ্চিমা বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং তাদের সমমনা তৃতীয় বিশ্বের প্রতিষ্ঠানসমূহ (ক্লেইন, ৪৩০)। অ্যাকর্ডের গঠন প্রক্রিয়া বাহ্যিকভাবে কিছুটা ভিন্ন হলেও অ্যালায়েন্সের মাঝে আমরা ক্লেইন উল্লিখিত সীমাবদ্ধতার প্রতিটি লক্ষ্য করি। কর্পোরেট কোডগুলোর মূল উদ্দেশ্য থাকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশমিত করা। বস্তুগত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের বিষয়টি থাকে গৌণ। কোডগুলো বেশিরভাগ সময়ে লেখা হয় ইংরেজি বা অন্য কোন আধিপত্যবাদী ভাষায়। শ্রমিকদের স্থানীয় ভাষায় এগুলো কদাচিৎ অনুদিত হয়। গ্লোবাল অ্যাসেম্বলি লাইনে কন্ট্রাকটর এবং সাব-কন্ট্রাকটরদের জটিল মিথষ্ক্রিয়ায় এই কোডগুলো সাধারণত অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারে না। অনেকক্ষেত্রে বিভিন্ন কোডের মাঝে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। ক্লেইন তাঁর আলোচনায় দেখিয়েছেন, কীভাবে বিভিন্নধরণের কোডের ভিড়ে প্রায়শ প্রতিটি কোডের যথাযথ বাস্তবায়নের দিকে নজর দেয়া সম্ভব হয় না (ক্লেইন, ৪৩১)। আমেরিকা ও ইউরোপের র্ব্যান্ডগুলোর মধ্যে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কোনটিতে স্বাক্ষর করা হবে তা নিয়ে সু¯পষ্ট মতবিরোধ আছে। গ্যাপ ও ওয়ালমার্টের মত অনেক র্ব্যান্ড তূলনামূলকভাবে শিথিল অ্যালায়েন্সের পক্ষপাতী। অপরদিকে ইউরোপের এইচ অ্যান্ড এম, মার্ক অ্যান্ড ¯েপন্সার, যারাসহ অন্যান্য অনেক র্ব্যান্ড অ্যাকর্ডকে সমর্থন করেছে। আমেরিকার অনেক রাজ্যে এখন ভোক্তা ও শ্রম অধিকার সংগঠনসমূহ আমেরিকান র্ব্যান্ডগুলোকে অ্যালায়েন্সের পরিবর্তে অ্যাকর্ড বাস্তবায়ন করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে আন্দোলন করছেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রায় একই সময়ে প্রণীত অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের মাঝে সমন্বয়ের অভাব সু¯পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের যেসব কারখানা একই সাথে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সে স্বাক্ষরকারী র্ব্যান্ডের জন্য উৎপাদন করে, তাদেরকে কর্মপরিবেশের কোন ধরণের মানদন্ড অনুসরণ করতে হবে বা তারা বিভিন্ন র্ব্যান্ড থেকে কোন ধরণের আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পাবে বিষয়টি পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক আন্দোলনের নেতা ও সংগঠনের মাঝে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নিয়ে বিভ্রান্তি এবং অসন্তোষ লক্ষ্য করা গেছে। ক্লেইনের মতে, কোড প্রণয়নের সময় অনেকক্ষেত্রে মানবাধিকার ও শ্রম সংগঠনসমূহ যেভাবে কর্পোরেশানগুলোকে প্রশ্নাতীতভাবে সহযোগিতা করে তা বিস্ময়কর। মানবাধিকার ও শ্রম সংগঠন এবং কর্পোরেশানের উদ্দেশ্য ও কার্যপ্রণালী এক হওয়ার কথা নয়। কিন্তু মানবাধিকার ও শ্রম সংগঠন যখন কাঠামোগত বৈষম্যকে প্রশ্ন না করে কর্পোরেশানের মত আচরণ করতে শুরু করে, তখন পুরো ব্যাপারটি ভীষণ হতাশাব্যঞ্জক হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় দেখা যায় মানবাধিকার বা শ্রম অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা দেশের নিজস্ব শ্রম আইনের লঙ্ঘণকে গুরুত্ব না দিয়ে কর্পোরেট কোড অফ কনডাক্ট লঙ্ঘিত হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অথচ কর্পোরেট কোডগুলোর বেশিরভাগই লঙ্ঘণকারীর বিরুদ্ধে কোন আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে না। আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকে সাধারণত দেশীয় শ্রম আইনে। অনেক অ্যাক্টিভিস্টের মতে দেশীয় আইনের লঙ্ঘণের চেয়ে কর্পোরেশানের কোড অফ কনডাক্ট লঙ্ঘিত হওয়াকে আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে তুলে ধরতে পারলে আন্তর্জাতিক প্রেস, মানবাধিকার সংগঠন এবং জনগণের সমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া যায় (ক্লেইন, ৪৩৫-৪৩৭)। ক্লেইনের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, অ্যালায়েন্স কর্পোরেশন কর্তৃক প্রণীত একটি একপাক্ষিক কোড। একারণে অ্যালায়েন্স অনেক শ্রম ও মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী ও সংগঠনের কঠোর সমালোচনার শিকার হয়েছে। অপরদিকে অ্যাকর্ড প্রণয়ণের বিভিন্ন ধাপে ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন, ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক, ওয়ার্কার রাইটস কনসর্শিয়াম, ইনডাস্ট্রিঅলের মত আন্তর্জাতিক সংগঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠন বিভিন্নভাবে জড়িত ছিলো। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে অনেক শ্রমিক সংগঠনের কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের কোন কোন সংগঠন অ্যাকর্ড বিষয়ক আলোচনায় অংশগ্রহণ করবে তা নির্ধারণ করার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি প্রতিনিধিত্বমূলক ছিলো না। আবার শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যে যারা অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন, তাদের অনেকেই সিদ্ধান্তগ্রহণে কর্পোরেশানের আধিপত্যের ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন। সুতরাং কর্পোরেশান ছাড়াও ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রম অধিকার সংগঠন ও এনজিওদের সাথে আলোচনা করে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অ্যাকর্ড প্রণয়ন করা হয়েছে দাবী করা হলেও শ্রমিকের কল্যাণসাধন অ্যাকর্ডের প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু ছিলো না। কর্পোরেশানের স্বার্থকে সর্বাধিকার দিয়ে র্ব্যান্ড ইমেজ রক্ষার জন্য কারখানার কর্মপরিবেশের যতটুকু পরিবর্তন আনা দরকার ঠিক ততটুকু পরিবর্তন আনার জন্য অ্যাকর্ড কাজ করছে। ক্লেইনের মতে, র্ব্যান্ডনির্ভর উদ্যোগ মনে করে ভোক্তা চাইলেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ভোক্তার হাতে পরিবর্তনের কিছু ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ভোক্তা কখনই সকল ক্ষমতার উৎস নয়। ব্র“কসের আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে র্ব্যান্ডনির্ভর অ্যাক্টিভিজম কীভাবে ধরেই নেয় যে প্রথম বিশ্বের ভোক্তাদের পক্ষে তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিকদের সকল সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। র্ব্যান্ডনির্ভর অ্যাক্টিভিজম প্রথম বিশ্বের লেন্স দিয়ে তৃতীয় বিশ্বকে দেখে এবং তৃতীয় বিশ্বের স্থানীয় চিত্র, স¤পর্ক,
আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে। এটি তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিককে অসহায়, ক্ষমতাহীন এবং প্রথম বিশ্বের ভোক্তা ও কর্পোরেশানের মুখাপেক্ষী হিসেবে চিত্রিত করে। ক্লেইন দাবী করেছেন, র্ব্যান্ডনির্ভর আন্দোলন ভোক্তাকেন্দ্রিক হওয়ায় এটি ভোক্তা যেসব পণ্য ভোগ করে শুধু সেসব পণ্যের উৎপাদকের কাজের পরিস্থিতির দিকে নজর দেয়। এটি পশ্চিমা ভোক্তা যাতে কোন ধরণের অপরাধবোধে না ভুগে নিশ্চিন্তমনে শপিং করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে চায়। ফলে র্ব্যান্ডনির্ভর আন্দোলন অনেকসময় “এথিক্যাল শপিং গাইড” নিয়ে উপস্থিত হয়। প্রথম বিশ্বের ভোক্তা তখন নাইকির জুতা না কিনে অ্যাডিডাসের জুতা কিনে সন্তুষ্ট থাকে এবং বৈশ্বিক ও স্থানীক কাঠামোগত বৈষম্য, মুক্তবাজার অর্থনীতি বা নিওলিবারেল নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়োজনবোধ করে না (ক্লেইন ২০০০, ৪২১-৪২২)। নব্বইয়ের দশকের হার্কিন বিল বা ওয়ালমার্টের “মেইড ইন আমেরিকা” ক্যা¤েপইন শিশু অধিকার রক্ষার সহজ সমাধান খুঁজে পেয়েছিলো বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য বয়কটের মধ্য দিয়ে। অথচ বাংলাদেশের শিশুরা কেন কাজ করতে বাধ্য হয়, কারখানায় শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করা হলে এই শিশুরা কোথায় যাবে, আমেরিকার পণ্য ব্যবহার করলেই কি বাংলাদেশের শিশুদের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন ঘটবে কিনা এবং পুরো পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদে কোন ধরণের উদ্যোগ নেয়া উচিত – এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো হার্কিন বিল বা “মেইড ইন আমেরিকা” ক্যা¤েপইন উদ্দেশ্য করেনি। আবার একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে আমরা লক্ষ্য করি অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সের মত উদ্যোগগুলোও মুক্ত বাজার অর্থনীতির কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করে। কখনও কখনও বাহ্যিকভাবে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও সংগঠনকে পরিকল্পনা বিষয়ক আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার সবসময় কর্পোরেশানেরই থাকে। ফলে কর্পোরেশানের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্স দেয় না। বর্তমানে প্রথম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্লিন ক্লথ ক্যা¤েপইন, ম্যাকুইলা সলিডারিটি নেটওয়ার্ক বা ইউনাইটেড স্টুডেন্টস এগেইনস্ট সোয়েটশপের মত সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে র্ব্যান্ডগুলোকে অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সে স্বাক্ষর করানোর লক্ষ্যে ভোক্তাগণ আন্দোলন করে যাচ্ছেন। ভোক্তার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয়ক্ষমতাকে মূল শক্তি হিসেবে ধরে বয়কটের হুমকি দিয়ে র্ব্যান্ডগুলোর ওপর অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ তৈরি করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য হয়তো মহৎ হলেও প্রথমবিশ্বের ভোক্তাগণ আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছেন কর্পোরেশন প্রণীত একটি কোড। তৃতীয় বিশ্বের সরকার বা আইএলও প্রণীত শ্রমবিষয়ক আইন ও নীতি বাস্তবায়নের দাবীর পরিবর্তে কর্পোরেশানের নেতৃত্বে তৈরি করা একটি প্রাইভেট কোড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্স বিষয়ক পূর্বের আলোচনা এবং নব্বইয়ের দশকের উদাহরণের প্রেক্ষিতে ক্লেইনের সাথে একমত প্রকাশ করে বলা যায়, অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সকে কেন্দ্র করে ভোক্তা বা কর্পোরেশানদের নেয়া উদ্যোগসমূহ পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পরিবর্তন আনবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম। র্ব্যান্ডনির্ভর অ্যাক্টিভিজম অনেক ক্ষেত্রে সার্বিক পরিবর্তনের পরিবর্তে প্রতীকী রুপ নেয়। নাইকিকে বয়কট করা হলে অ্যাডিডাস হয়তো বিকল্প পছন্দ হিসেবে এগিয়ে যায়। শেলের কর্পোরেট দমননীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় দেখা গেলো শেলের হারানো কনট্রাক্টগুলো পেয়ে যাচ্ছে শেভরন। এভাবে ক্রেতাদের সামনে একটি কর্পোরেশনের পরিবর্তে অন্য আরেকটি কর্পোরেশান নীতিগত বিকল্প হিসেবে উপস্থিত হয়। অথচ শ্রমিকের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে অ্যাডিডাস বা শেভরন যে নাইকি বা শেলের চেয়ে বেশি সচেতন তা বলা যায় না। এই কো¤পানিগুলোর প্রত্যেকে সর্বোচ্চ মুনাফা লাভের জন্য তৃতীয় বিশ্বের সস্তা শ্রমকে নানাভাবে দমন ও নিপীড়ন করছে (ক্লেইন ১৯৯৯, ৪২২-৪২৪)। রানা প্লাজায় দুর্যোগের পরবর্তী সময়ে শুধু এক র্ব্যান্ড যে অপর র্ব্যান্ডের নীতিগত বিকল্প হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে তা নয়, কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নের জন্য র্ব্যান্ড কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের একটিকে অপরটির নীতিগত বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। র্ব্যান্ডগুলো তাদের সুবিধা অনুযায়ী অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সে স্বাক্ষর করে নিজেদের র্ব্যান্ড ইমেজ রক্ষা করার চেষ্টায় ব্যাপৃত। ব্র“কসের আলোচনায় আমরা গঙটকে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজ করা মাত্র ৪% শিশুর অধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে দেখি। কিন্তু বাকি যে ৯৬% শিশু অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজ করে, অর্থাৎ কর্পোরেট র্ব্যান্ডের সাথে যাদের সরাসরি যোগাযোগ নেই, তাদের অধিকার বা কাজের পরিবেশ নিয়ে গঙট, কর্পোরেশান বা শ্রম আন্দোলনের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মীদের কেউই তেমন এগিয়ে আসেনি। শ্রম আন্দোলন অতিরিক্ত র্ব্যান্ডকেন্দ্রিক হয়ে গেলে যেসব শ্রমিকের সাথে র্ব্যান্ডের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই, সেসব শ্রমিকের অধিকারের বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। ক্লেইন বলেছেন, যে শিশুরা ফসলের মাঠে বিষাক্ত কীটনাশকের মাঝে বা বিপদজনক মাইনপূর্ণ এলাকায় অথবা স্টিল ফ্যাক্টরিতে কাজ করে, তাদের কেউই সকার বল তৈরি করা শিশুদের মত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে না (ক্লেইন, ৪২৪)। একই ব্যাপার আমরা লক্ষ্য করি অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের ক্ষেত্রেও। দুটি উদ্যোগই শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোকে লক্ষ্য করে কাজ করে কারণ এই কারখানাগুলোর সাথে র্ব্যান্ডের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। কিন্তু বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ কারখানা তৃতীয় টায়ারে পড়ে (বিয়ারনট)। এই কারখানাগুলো সাবকন্ট্রাক্টের মাধ্যমে প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলোর কাছ থেকে অর্ডার নেয়। র্ব্যান্ডের সাথে সরাসরি কাজ না করায় অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সের কোন প্রভাব এই কারখানাগুলোর ওপর পড়বে না। অ্যালায়েন্স সাব-কন্ট্রাক্ট দেয়ার চর্চাকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। সাব-কন্ট্রাক্ট নিষিদ্ধ করা হলেই যে সাব-কন্ট্রাক্ট দেয়া বন্ধ হয়ে যাবে তা হয়। সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন ও র্ব্যান্ডের অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য সরবরাহের দাবী পূরণের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় টায়ারের কারখানাগুলো বার বার তৃতীয় টায়ারের কারখানাগুলোর শরণাপন্ন হবে। কিন্তু তৃতীয় টায়ারের কারখানায় সাব-কন্ট্রাক্টের কাজ চলাকালে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে র্ব্যান্ড খুব সহজে “বেআইনী”ভাবে সাব-কন্ট্রাক্টের কাজ দেয়া হয়েছে দাবী করে নিজেদের দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারবে। ক্লেইনের মতে, ইউনিয়ন, আইন, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে শিল্পক্ষেত্রের কর্মপরিবেশে যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব, অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সের মত কর্পোরেট কোড অফ কন্ডাক্ট সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। বিগত শতকের বিশ এবং তিরিশের দশকে পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক আলোচনার মূখ্য বিষয় ছিলো কর্মপরিবেশ, শিশুশ্রম এবং শ্রমিকের স্বাস্থ্য। এই বিষয়গুলোর উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে ইউনিয়ন, শ্রমিক ও মালিকের মাঝে প্রত্যক্ষ দরকষাকষি এবং নতুন নতুন কঠোর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। একইভাবে বর্তমানেও স্থানীয় এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে শ্রমিকের কাজের পরিবেশের পরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মত সংগঠনগুলো মুক্ত বাজার অর্থনীতির জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে যতটা আগ্রহী, আন্তর্জাতিক শ্রমবিষয়ক চুক্তি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের অন্য ততটা আগ্রহী নয়। কর্মপরিবেশের অবস্থা কেমন হওয়া উচিত সেটি আইন এবং সরকারের পরিবর্তে এখন নির্ধারণ করছে বিভিন্ন প্রাইভেট কোড। বহুজাতিক কর্পোরেশান প্রণীত কোড অফ কন্ডাক্ট কোন গণতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত আইন নয়। এটি কর্পোরেশানগুলোকে নিজেদের সুবিধামত একটি প্রাইভেট আইনব্যবস্থা তৈরির এবং সেই আইনের অধীনে সুবিধামত নিজেদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। ক্রমে কর্পোরেশানগুলো জাতিরাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করে নিজেরাই আংশিক জাতিরাষ্ট্রের মত আচরণ করতে শুরু করে (ক্লেইন, ৪৩৭)। ক্লেইনের পর্যবেক্ষণটি অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সের ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য। অ্যাকর্ড বা অ্যালায়েন্সকে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার পরিস্থিতি উন্নয়নের চূড়ান্ত নির্দেশনা হিসেবে ধরে নিলে বস্তুগত পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা খুবই কম। শ্রমিকের জীবনযাত্রা ও কাজের পরিবেশের ইতিবাচক পরিবর্তন করতে হলে একদিকে সরকার ও আইএলও কর্তৃক প্রণীত কঠোর ও প্রগতিশীল আইন অনুযায়ী শ্রমিকের জন্য কাজের যথাযথ শর্ত, নিরাপত্তা, সুবিধা ও পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার, অন্যদিকে কর্পোরেশানগুলোরও যেকোন মূল্যে সবচেয়ে সস্তা শ্রম খোঁজার নীতি থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন।

 

নাফিসা তানজিম।।পিএইচডি গবেষক,রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র।।

Facebook Comments